ব্রেকিং নিউজ
Home | শীর্ষ সংবাদ | বজ্রপাত

বজ্রপাত

263

ওমর ফারুক : জঙ্গল নগর নামটা শুনে সবাই হাসে। জঙ্গলে নগর হয় কিভাবে? এই প্রশ্ন সায়মার বান্ধবীদেরও। সায়মাকে সারাক্ষণ জঙ্গলি বলে ক্ষ্যাপায় তার বান্ধবীরা। সায়মা এতে রাগে না, বরং খুশি হয়। সে ভাবে, ক্ষ্যাপাতে গিয়ে তার গ্রামের নাম সবাই বারবার বলে। তার গ্রামের নাম অন্যের মুখে শুনতে তার ভাল লাগে। সে এবার এগারোয় পড়েছে। দুই গ্রাম পর আলুখালী প্রাইমারি স্কুলে সে পড়ে। সবুজ কালারের ড্রেস পরে স্কুলে যেতে তার ভীষণ ভাল লাগে। কিন্তু সায়মার স্কুলে পড়া তার দাদী, চাচী সহ পুরা জঙ্গল নগরের কেউ পছন্দ করে না। সায়মার বাবা- মা চায় মেয়ে পড়ুক। বিয়ের আগে দেশগ্রামের কথা কিছু জানুক। জজ ব্যারিস্টার না হোক অন্তত বাজারের সদাইপাতির হিসাবটা নিজে মেলাতে শিখুক।

জঙ্গল নগর গ্রামটা হল তরমুজ বিক্রেতার ট্রেতে সাজিয়ে রাখা লাল টকটকে তরমুজের ফালির মত। পুরো গ্রামে কয়েকটা টিলা আছে। লালমাটির এরকম একটা টিলাতেই সায়মাদের বাড়ি। বাবা-মা, দেড় এবং তিন বছরের ছোট দুই ভাই নিয়ে তাদের সংসার। সায়মার বাবা লিয়াকত পাহাড়ের ঝিরিতে আবাদ করে। প্রতিদিন সকালে তার বাবা-মা ভাতের মোচা নিয়ে ঝিরিতে কাজ করতে চলে যায়। সায়মার দাদী তার বাবাকে ডেকে বলে,

-তোমরা মেয়েকেও কাজ করতে নিয়ে যাও ঝিরিতে।

– মা, ও ছোট মেয়ে। ঝিরিতে সে কি কাজ করবে? আমরা কয়েক পুরুষ ধরে সবাই তো সারাজীবন ঝিরিতে কাজ করে গেলাম। ও না হয় একটু পড়ুক।

-স্কুলে পড়িয়ে কি হবে? আমরা জীবনে কখনো স্কুলে যাইনি, তাতে কি আমাদের চলে যায়নি? ওর ও নিশ্চয় চলে যাবে।

– মা, ও একটু দেশ গ্রাম চিনুক। সে স্কুলে যাক।

– সে এখন বড় হয়ে উঠছে। তার শরীরের দিকে তাকা একটু। তার এখন বাড়ন্ত শরীর। এত পথ হেটে সে স্কুলে যায়। সারা পথ নির্জন। আমার ভয় হয়। গ্রামের লোকজনও বলে, মেয়েকে পড়িয়ে লাভ কি? বিয়ের পর চুলায় তো কাজ করবে।

– লোকজনের কথা শুনে তো মেয়েকে পড়ানো বন্ধ করতে পারব না। মেয়েটাও পড়তে আগ্রহী, আমাদেরও ইচ্ছে মেয়েটা পড়ুক।

-আমার ভয় হয় রে।

সেদিন তার দাদী এবং বাবার মধ্যে কথা আর বাড়েনি। কিন্তু সায়মা একটা জিনিস ভেবে কুলকিনারা করতে পারে না, যে বড় হয়ে যাওয়ার সাথে স্কুলের কি সম্পর্ক? তার তো পড়তে ইচ্ছে করে। বান্ধবীদের মুখে জঙ্গলি ডাক শুনতে তার বড্ড ভাল লাগে।

লোকটাকে সায়মা চেনে না। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে হাটিরকুমার গ্রামে যে দিকটাই আকাশী গাছের বাগান আছে সেদিকেই লোকটা দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে দেখলে বিশ্রী ভাবে তাকায়। উচ্চস্বরে আঞ্চলিক গান গায়। এই গান তার ভাল লাগে না। গানে টসটসে আমের কথা বলে। আম তো এখনো পাকে নাই। তারপরও পাকা আমের কথা লোকটা বলে কেন? সায়মা ভেবে কুলকিনারা করতে পারে না। লোকটা কেমন করে হাত দিয়ে পাঁচ আঙ্গুল তুলে আবার নামিয়ে ফেলে। মাঝেমাঝে লোকটা তার নিজের আঙ্গুল মুখে ঢুকিয়ে চুষে। মানুষ নিজের আঙ্গুল নিজে কেন চুষবে? সায়মা ভেবে অবাক হয়ে যায়। একদিন লোকটা বিশ্রী কান্ড করে বসে। লোকটা কেমন করে তাকে ডাকে। সায়মার ঘিন লাগে। বাসায় গিয়ে বমি করে ফেলে। ওয়াক! তার মা ভাবে সারাদিন স্কুলে কিছু না খাওয়ায়, রোদে স্কুল করায় সে বমি করে। লজ্জার কথা সে তার মাকে বলতে পারে না।

স্কুলে তার সব বান্ধবীরা হাসিখুশি থাকে সারাক্ষণ। সায়মা মনমরা থাকে। সে ভাবে, যদি
বিশ্রী লোকটার কথা তার মাকে বলে তাহলে হয়ত তাকে আর স্কুলে আসতে দিবে না। তার ভয় হয়। স্কুলে না আসতে পারার ভয়। কেন লোকটা এমন করে?

স্কুল ছুটি হতে আরো ঘন্টাখানেক বাকী আছে। হঠাৎ চারিদিকে অন্ধকার হয়ে যায়। ক্লাসের ম্যাডাম লাইট জ্বালিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর ঠাডা পড়তে থাকে। সায়মার বান্ধবীরা এক জায়গায় জড়ো হয়ে যায়। বজ্রপাতের তালে তালে সায়মা তার ছোট দুই ভাইয়ের কথা ভাবতে থাকে। তার বাবা-মায়ের কথা ভাবে। সায়মা শুনেছিল বজ্রপাতে নাকি মানুষ মারা যায়। একবার তাদের গ্রামের নবী কাকা গরু আনতে পাহাড়ে গিয়েছিল। বজ্রাপাতে পড়ে মারা গিয়েছিল। তার বাবার কাছে শুনেছিল বজ্রপাতে পড়ে নবী কাকার মাথার চুল নাকি নারিকেলের ছোবড়ার মত হয়ে গেছিল। সায়মা দোয়া দরুদ পড়ে তার বাবা-মার সহিসালামতে ফেরার জন্য। বজ্রপাত হলে কি করবে ম্যাডামরা স্কুলে প্রতিদিন বলে। তালগাছ লাগালে নাকি বজ্রপাত কমে যাবে। সায়মার হাসি পায়। তালগাছের সাথে বজ্রপাতের কি সম্পর্ক থাকতে পারে সে ভেবে পায় না। নিশ্চয় আছে নইলে ফাহমিদা ম্যাডাম বলত না। কারো কথা বিশ্বাস না করলেও ফাহমিদা ম্যাডামের কথা সে বিশ্বাস করে। বিশ্রী লোকটার কথা ম্যাডামকে বলতে পারলে অনেক ভাল হত। লজ্জায় সে বলতে পারে না।

বৃষ্টি কমে গেলে স্কুল ছুটি হয়ে যায়। বান্ধবীরা মিলে অনেকদূর যাওয়ার পর সায়মা একা হয়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে আজকে বিশ্রী লোকটা থাকবে না। বৃষ্টির মধ্যে লোকটার থাকার কথা না। তারপরও সে ভয়ে ভয়ে পা বাড়ায়। কিছুদূর যাওয়ার পর সে লোকটাকে দেখতে পায়। সে এখন কি করবে? বাড়ির দিকে দৌড় দিবে নাকি স্কুলের দিকে? স্কুলে এখন কেউ থাকবে না। সেদিকে দৌড় দিয়ে কোন লাভ নাই। সে বাড়ির পথেই রওয়ানা দেয়। মুরগির বাচ্চারা বনবিড়াল দেখলে যেভাবে দৌড়ায় ঠিক সেভাবে দৌড়ায়। কিন্তু আজকে লোকটা তাকে জাপটে ধরে ফেলে।

লোকটা বুকের সাথে চেপে ধরে রাস্তা থেকে বাইরে নিয়ে যেতে থাকল। যেদিকে ঘন জঙ্গল বেশি সেদিকের আকাশী বাগানে তাকে নিয়ে গেল। তাকে অমন করে চেপে ধরছে কেন! বজ্রপাত শুনলে যে ভয় হয়, তার চেয়েও ভয় বেশি করছে। লোকটা তার একটা হাত সায়মার ফ্রকের বুকের কাছটায় ঢুকিয়ে দিতে চাইছে। সে প্রাণপণে চেষ্টা করছে তার হাতটাকে আটকে রাখতে, কিন্তু পারছে না। লোকটার গায়ে যেন ক্রমশই পশুরশক্তি ভর করছে। তাদের বাড়িতে কোরবানে বিক্রি করার জন্য যে ষাঁড়টা বড় করতেছে তার বাবা তার মত শক্তি লোকটার। ষাঁড়টা মাঝেমাঝে দড়ি ছিড়ে যেভাবে সবকিছু ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলতে চায়, লোকটাও তাকে চুরমার করে ফেলতে চাইছে। সায়মা কান্না করে চলছে। তার কান্নার শব্দ মেঘের শব্দের সাথে হারিয়ে যাচ্ছে। চোখের পানি বৃষ্টিতে মিশে যাচ্ছে। লোকটা সায়মার সারা শরীরে তেলাপোকার মত কিলবিল করছে। তেলাপোকা এক ঝাটকায় ফেলে দিতে পারলেও লোকটাকে সে পারছে না। আচমকা বিকট শব্দে কাছেই বজ্রপাত হলো। সেই শব্দে লোকটা সায়মাকে ছেড়ে দিল। লোকটা দাঁড়িয়ে গেল। লোকটা দাঁড়িয়ে রইল। তাকে কিছু বলছে না। সেও দাঁড়িয়ে গেল। সে এক পা দু পা করে পেছনে হাঁটতে লাগল। তারপরও লোকটা কিছু বলছে না। এরপর সায়মা দৌড়ে সোজা বাড়ি চলে আসল।

বাড়িতে ফিরে সে সবাইকে খুঁজে পায়। বাবা-মা রা আরো আগে চলে এসেছে। স্কুল ড্রেসের সাথে লাল মাটির কাদা লেপ্টে থাকতে দেখে তার মা এগুলো কোথা থেকে লাগল জিজ্ঞেস করে। সে কোন জবাব দেয়নি। সে জামাটা পরিবর্তন করে শুয়ে পড়ে। প্রচণ্ড ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে ঘুমিয়ে যায়।

অনেক গভীর রাতে তার বাবা তার মাকে ডেকে বলে, হাটিরকুমারের আকাশী বনে তোরাইব্বা ঠাডা পইরা মরে গেছে। আচানক সায়মার শরীরের ব্যাথা কমে যায়। সে একটু করে হাসে। তার হাসি অন্ধকারে কেউ দেখতে না পেলেও তোরাইব্বা নিশ্চয় দেখতে পাবে।

লেখক : সহকারী শিক্ষা অফিসার, লোহাগাড়া উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*