ব্রেকিং নিউজ
Home | উন্মুক্ত পাতা | প্রিয় বাবাকে না পাঠানো চিঠি

প্রিয় বাবাকে না পাঠানো চিঠি

117

বাবা,
অনেকদিন ধরেই তোমাকে লিখব লিখব করে লিখা হচ্ছেনা। বলা যায়, লিখতে পারছিনা। লিখতে বসলেই অজস্র স্মৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছি আমি। মাথার ভিতর তোলপাড় করছে ঘটনা প্রবাহ। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখব ভেবে পাচ্ছিনা। তাই বোধহয় এই চিঠিতে তোমায় কোন সম্ভাষণ জানাতে পারলাম না। কারণ, তোমাকে কোন সম্ভাষণে সম্ভাষিত করবো আমি বুঝতে পারছিনা। যাই করি না কেন তা তোমার জন্য অতি নগন্য হয়ে যাবে।

জানো বাবা, তোমাকে তো এভাবে চিঠি লিখিনি তাই হাতটা কাঁপছে। ঠিকমত লিখতে পারছিনা। মাকে নিয়ে লিখেছি তখনো এমন হয়নি। প্রচুর লিখেছি। আমি এও হলফ করে বলতে পারি পৃথিবীতে যে পরিমান সাহিত্য মাকে নিয়ে হয়েছে সে পরিমাণ লিখা বাবাকে নিয়ে হয়নি। হয়তো দরকার পরেনি।

এতদিন তোমাকে নিয়ে লিখিনি। কারণ আমি মনে করি আমার ভিতরেই তো বাবা আছে, আমিইতো
বাবা। তাই বাবার কথা আলাদা করে লিখার কিংবা বলার দরকার পড়েনা। তবে জানো আজ তোমাকে নিয়ে খুব লিখতে ইচ্ছে করছে। প্রত্যেকটা সন্তানই বোধ হয় জীবনের একটা পর্যায়ে বাবাকে খুব মিস করে।

বাবার কথা খুব ভাবে। মনে হয় বাবা নামক সেই মানুষটা যদি এই মুহুর্তে আমার মাথায় তার অকৃত্রিম স্নেহের হাতটা বুলিয়ে দিতো সব সমস্যা যেন দূর হয়ে যেত। এখন আমি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি বাবা। নিজের স্বপ্নের সাথে বাস্তবতার অনেক অমিল তা এখন বুঝতে পারছি। চারদিকে অজস্র মিথ্যার ভিড়ে একটা সত্যের পিছনে ছুটছি নিরন্তর। পৃথিবীতে এত মানুষ কিন্তু একজন মানুষই মিলেনা অকৃত্রিম ভালবাসা উপহার দেবার। আর ঠিক তক্ষুনি আমার মনে হয় তোমার কথা। অনেক আনন্দের মুহুর্তে যে মানুষটা অবিচল থেকে আমাকে স্মরণ করে দিয়েছে ভবিষ্যতের কথা ।

আমার খুব মনে পড়ে এসএসসি-তে এ রেজাল্ট পেয়ে যেদিন আমি বাসায় এসে খবরটা দিলাম আর তুমি বললে- মাশাআল্লাহ। ভালো হয়েছে ইন্টারমিডিয়েটের জন্য প্রস্তুতি নাও। এটাই শেষ নয়। সামনে আরো কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। সেদিন তোমাকে আমার খুব বেরসিক কাটখোট্টা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল এ লোকটা কি হাসতে জানেনা? এই লোকটার মনে কি সন্তুষ্টি বলে কোন কথা নেই।

তখন বুঝতে পারতাম না বাবা, যে তোমার ঐ কঠিন মাথার ভিতরেও যে পরিমাণ ভালবাসা লুকায়িত ছিলো পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা জড়ো করলেও তার সমতূল্য হতে পারেনা। কিন্তু সেই ভালোবাসা বুঝেছিলাম যেদিন আমি কলেজে ভর্তি হবার জন্য বাড়ি ছেড়ে আসছিলাম সেদিন। বাস ছাড়ার আগ মুহুর্তে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কি যেনো বলতে চাইছিলে কিন্তু বলতে পারছিলেনা।

বারবার যেনো তোমার গলায় কথাগুলো আটকে যাচ্ছিলো। অনেক কষ্টে ভেজা গলায় আমাকে তুমি
বলেছিলে ভালো থেকো। তোমার চোখ ছলছল করে উঠছিলো। তাড়াতাড়ি করে বাস থেকে নেমে
গিয়েছিলে তুমি।

তুমি জানোনা বাবা সেদিন সারাক্ষণ তোমার কথা মনে পড়ছিলো। কতবার মনের কান্নায় চোখের
কোণ ভিজে গিয়েছিলো তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবনা। শুধু এতটুকু জানি সেদিন মনে মনে
বোধহয় খুব করে বলেছিলাম- বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি, বাবা। খুব ভালোবাসি তোমাকে।
তোমাকে হয়তো মুখ ফুটে কখনো বলা হয় নি কিন্তু তোমাকে খুব ভালোবাসি বাবা।

তোমার নিশ্চয় মনে আছে বাবা, আমি খুব দুষ্ট ছিলাম। ছোটবেলায় আমাকে যখন পড়া শেখাতে বসতে তখনতো আমায় খুব মারতে। একটা ভুল হলেই আর রক্ষা নেই। আর তোমার মার থেকে আমাকে আগলে রাখতে গিয়ে মাকে যে কি পরিমাণ মার খেতে হয়েছে তাতো তুমি জানো। একটা জিনিসকে বারবার অনুশীলনের মাধ্যমে তুমি আমাকে যেভাবে স্বচ্ছ আর দক্ষ করে গড়ে তুলেছিলে তা এখন খুব মনে পড়ে।

এখনতো মনে হয় বাবা তুমি আমাকে আরো বেশি মারলেনা কেনো? তাহলে হয়তো আমার জীবনটা
আরো অনেকখানি সুন্দর হতে পারতো। আমার খুব মনে পড়ে বাবা, আমাকে মারার পর প্রতিবারেই তুমি মাকে বলতে – দেখ আমার ছেলে নিশ্চয় পারবে। আমার বিশ্বাস আছে ওর প্রতি। পাশের বিছানায় আমার যে তখনো পুরোপুরি ঘুম আসেনি তা তোমরা জানতে না, বাবা। কতদিন তোমাদের কথা শুনে কান্নায় আমি বালিশ ভিজিয়েছি তা তুমি জানো না, বাবা। একটা জিনিস ভেবে এখন খুব মুগ্ধ হই বাবা। কলেজের ডাইনীংয়ে ভালো তরকারির নাম করে আণুবীক্ষণিক সাইজের প্রোটিন আর হাত ধোয়া পানির সমতূল্য ডাল দিয়ে খেতে খেতে পাকস্থলী যখন পঁচে যাবার যোগার তখন তোমার কথা খুব মনে পড়ে, বাবা। বাহিরে কোন খাওয়া দাওয়ার আয়োজনে গেলে সেই খাবারের প্যাকেট তুমি বাসায় নিয়ে আসতে। এক প্যাকেট খাবার তিন ভাইয়ের জন্য হতো না। মা প্রায়ই বলতো- ওখানে খেয়ে এলেনা কেনো? তুমি বলতে ছেলেদের ছেড়ে কেমন করে খাই? মা আর কিছু বলতোনা।

মাঝে মাঝে এমনও হতো, তোমার হয়তো কোথাও দাওয়াত পড়ে গেছে। তুমি সেখানে যাওয়ার আগে যে করেই হোক ভালো একটা তরকারি মাকে এনে দিতে। তারপর দাওয়াতে যেতে। কারণ, তুমি মনে করতে আমিতো দাওয়াতের বাড়িতে ভালোই খাবো কিন্তু আমার সন্তানদের জন্যও তো ভালো কিছু করা দরকার। আমি দেখতাম আমরা তিন ভাইয়ের কেউ অসুস্থ হলে বাসায় ভালো কোনো তরকারি রান্না হতোনা। তুমি বলতে ছেলেটা অসুস্থ আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না। বাবা, তুমি এতো ভালো কেনো? কতবার যে বড়াই করে ভেবেছি তোমার কাছ থেকে আর একটা পয়সাও নিবোনা। নিজে যেভাবে হোক চলবো। তবু তোমার কাছ থেকে টাকা-পয়সা নিয়ে তার জন্য এতো কথা শুনতে পারবোনা। কিন্তু আমি পারিনি, বাবা। রাগ কেটে যাবার পরই আবার আমাকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখেছো তুমি। আর মাকে বলেছো দেখে নিও, আমার ছেলে পারবে। ও খুব ভালো করবে। আমার সে বিশ্বাস আছে। হ্যা বাবা, তোমার সেই বিশ্বাসই আমাকে দৃঢ় হতে শিখিয়েছে। আমাকে স্বপ্নবান হতে শিখিয়েছে। সেই থেকে যে কোনো প্রয়োজনে তোমার কাছ থেকেই টাকা পয়সা নিয়েছি। হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় বেশিই নিয়েছি। কই কেউতো এতটুকু সাহায্য করেনি। তুমি করেছো। আর করবেই না কেনো? তুমি যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা। যে বাবার সন্তানের প্রতি আকাশসম বিশ্বাস।

তোমার কাছ থেকে পাওয়া সব শিক্ষার মধ্যে অন্যতম হলো আদর্শের শিক্ষা, মনুষ্যত্বের শিক্ষা। যাকে আমি বলি অপরের ভালো চাওয়ার শিক্ষা। তোমার মনে আছে কিনা জানিনা বাবা। আমি তখন ক্লাশ ফোর-এ পড়ি । তুমি বাসায় ছিলেনা। বিকেলে মা আমাকে দুধ আনতে পাঠিয়েছিলো। দুধের কেজি তখন বারো টাকা, সেটাইছিলো আমার জীবনের প্রথম বাজারে যাওয়া। আমাকে দেয়া হয়েছিলো বিশ টাকার নোট। আমি এক কেজি দুধ নিয়ে বাড়িতে এসে কোনো রকমে মাকে দুধের বোতল দিয়েই মাঠে চলে যাই খেলতে। বাকী টাকা আমার জিন্স প্যান্টের পকেটেই থেকে যাই। রাতে তুমি যখন বাসায় ফিরলে তখন মা বললো- তোমার ছেলেতো আজকে বাজার করে এনেছে। তুমি খুশি হয়ে আমাকে বললে- তাই নাকি? আমার বাবাটাতো তাহলে অনেক বড়ো হয়ে গেছে। আর মজার ছলে আমাকে বললে- কতটাকা দিয়ে দুধ কিনেছো বাবা? আমি বললাম- বারো টাকা । তাহলে বাকী টাকা কি মাকে দিয়েছো ? তখন আমার মনে পড়লো-বাকি টাকা আমার পকেটেই রয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি পকেটে হাত দিয়ে দেখি- তিনটা দুই টাকার নোট।

থাকার কথা চারটি। ঐ পকেট থেকে টাকা পড়ে যাবারও কোনো সম্ভাবনা নেই। তারমানে দুধওয়ালা
আমাকে ঠকিয়েছে। আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হিসেব ভুল করায় তুমি বোধহয় আমাকে মারবে। কিন্তু না সেদিন তুমি আমাকে মারোনি। কিন্তু তার বদলে তুমি আমাকে এমন কিছু কথা শুনিয়েছিলে, যা আমার দৃষ্টিভঙ্গিকেই পাল্টে দিয়েছিলো। তুমি বলেছিলে- “দুই টাকা ঠকে এসেছো, সেটা কোনো ব্যাপার না। কিন্তু ব্যাপার হলো, তুমি কাউকে দুই টাকা ঠকাওনি। এটাই সবচেয়ে ভালো বিষয়। শোনো বাবা তুমি যদি কখনো কারো উপকার করতে না পারো ক্ষতি নেই। তবে তোমার কাছ থেকে কেউ যেন ক্ষতির সম্মুখীন না হয়।”

আজ সেই কথাগুলো খুব কাজে লাগছে বাবা। আমাকে যে যেভাবে পারে সেভাবে ঠকিয়েছে কিন্তু আমি কাউকে ঠকাইনি বাবা। তাই হয়তো আজো বিছানায় শোয়ার সাথে সাথেই আমার ঘুম আসে।
তুমিইতো বলতে- “বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে যার ঘুম আসে সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ।”
আমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। মাঝে মাঝে আমার খুব ভয় হয়, বাবা । এই যে, আমাকে নিয়ে তোমার এতো স্বপ্ন। কতোটুকুই বা পুরণ করতে পারবো? তবে একটা বিশ্বাস কি বাবা জানো? আমার মনে হয় আমি পারবো। আর এ কারণেই পারবো যে, তোমার বিশ্বাস আমি পারবো, ইনশাআল্লাহ! অন্তত ততোদিন পর্যন্ত পারবো যতদিন তোমার স্নেহের হাত আমার মাথার উপর আছে। আমাকে যে পারতেই হবে, বাবা। কারণ, তোমার স্বপ্নমাখা চোখ যে আমার দিকে তাকিয়ে।

তুমি এমন কেনো বাবা? সবসময় আড়ালে আড়ালে ভালোবেসে যাও। মুখে কিছু বলো না। প্রাইভেট পড়ার জন্য নির্ধারিত টাকার চেয়ে বেশি টাকা নিয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে গল্পের বই কিনার জন্য তুমি আমাকে কতো বকেছো তার হিসেব নেই। আর সেই তুমিই নাকি এখন বাসায় আগত মেহমানদের আমার বইয়ের লাইব্রেরীটা দেখিয়ে বলো। আমার ছেলে একদম টাকা পয়সা নষ্ট করেনা। বই কেনে। এই যে, এতো এতো বই, সব বই তার পড়া। কতো দেশ-বিদেশের বই। গল্প, উপন্যাস, কবিতা, ভ্রমণ কাহিনী, প্রবন্ধ সবই আছে। জান বাবা, সে দিন ঘরে গেলাম। অকারনে চেচাচ্চিলাম। তুমি দিলে বকা। সইতে পারলাম না। নিজ কে সামলে নিতে পারচিলাম না। বাবা অনেক রাগ হয়ছিল  তোমার উপর। রাগে ঘর থেকে বের হয়ে জেতে চাইলাম। তুমি এসে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলে।জান বাবা সে দিন আমার সিদ্বান্ত তা ও ছিল মারাত্বক ভুল। পকেটে ছিল মাত্র ১৬ টাকা। কোথায় যেতাম আমি এই টাকা নিয়ে? আর কে আমাকে দিত তোমার মত করে  শান্তিময় আশ্রয়? সকাল হলো সবায় কে বলে দিলে আস্তে কথা বলতে। আমি নাকি রাতে ঘুমায়তে পারি নাই।বাবা তুমি এত্ত বুজ কেন আমাকে?ঘুম থেকে উঠে বললে তোমার সাথে আসতে। গেলাম। কথা গুলা শুনে বুজতে পারলাম বাবা জীবনে চলার পথে এর চাইতে আর কোন উপদেশ লাগবে না। বাবা এখনো কানে বাজে আমি নাকি তোমার হাটু। আমার উপর ভর দিয়ে তুমি শান্তির নিস্বাশ নিতে চাও।সত্তি কি বাবা তাই? পারব ত আমি তোমার আশ পূরণ করতে। ইনশাআল্লাহ চেস্টা করব বাবা। বাবা তোমার ছেলে এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন বাবা তোমার ছেলে তোমাকে হাতে ধরে রাস্তা পার করায়। বাবা তুমি তো আমাকে ও এক সময় পার করে ছিলে তাই না বাবা?বাবা আর একটু বড় হই।শুধু আর একটু। কথা দিচ্ছি তোমাকে তোমার সেই স্বপ্নের সন্তান কে তুমি পাবে। ঠিক তুমি জেমন চেয়েছিলে বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি।

জানো বাবা, মাঝে মাঝে তোমার প্রতি খুব রাগ হতো আমার। যখন আমি অসুস্থ হলে তুমি খুব রেগে
যেতে। রাগের মাথায় বলতে এতো অসুস্থ হয় কেনো? আর ওষুধের পিছনে টাকা-পয়সা খরচ করতে পারবো না। পড়াশুনার তো কোনো নামগন্ধ নেই। সারা জীবন অসুখ লেগেই আছে। অমুকের ছেলে কতো স্বাস্থ্যবান। তোমাকে কি কম খাওয়াই নাকি? এমন অসংখ্য কথা। তখন বুঝতামনা বাবা, এই কথাগুলোও ভালোবাসা। ভার্সিটিতে আসার পর প্রথম ছুটিতে যখন বাসায় গেলাম তখন খুব অসুস্থ হয়েছিলাম। তখনও তুমি রাগ করেছিলে। আমি তোমার রাগটাকে ভালোভাবে নিতে পারিনি। কিন্তু ভুল ভাঙ্গলো সেদিন যেদিন বাড়ি থেকে হলে চলে আসবো। তুমি আমাকে শুনিয়ে মাকে জোরে জোরে বলছিলে, বাড়ির বড় ছেলে অসুস্থ থাকলে কোন বাবারই ভালো লাগে না। আমি এও শুনছিলাম বাবা। নিচু গলায় তুমি মাকে বলছিলে ছেলেটা এবার অসুস্থ থাকলো। বাড়িতে ভালোমতো সময়টাও কাটাতে পারলোনা।

ভালোমতো কিছু খাওয়াতেও পারলাম না। বলতে বলতেই তোমার গলা ধরে এসেছিলো, বাবা। আমি জানি বাবা, তুমি তোমার সাধ্যের সবটুকু করছো। আমার চোখও যে সেদিন ছলছল করে উঠেছিলো তা তোমাকে দেখাতে পারিনি বাবা। ও, হ্যাঁ বাবা, আরো একটা কারণে, তোমার প্রতি আমার ভীষন অভিমান হতো। আমার পড়াশুনা নিয়ে কথা বললে তুমি প্রায়ই বলতে অমুক সাহেবের মেয়ে, তমুক সাহেবের ছেলে কতো ভালো রেজাল্ট করেছে। আর আমার ছেলে গোল্লায় যাচ্ছে। আর পড়াশুনার পিছনে কোন টাকা-পয়সা খরচ করতে পারবোনা। এবার রেজাল্ট খারাপ করলে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে জমি চাষ করতে লাগিয়ে দেবো। দরকার নেই এতো পড়াশুনার। মাসে মাসে কলেজের বেতন, প্রাইভেট ফি, বই-খাতা কলমের তো কোন হিসেবেই নেই। একবারও ভেবেছো এতো টাকা পয়সা কোথা থেকে আসে? খেয়ে না খেয়ে আমি সারাদিন গাধার মতো পরিশ্রম করি দুটো টাকা বেশি রোজগার করার জন্য। কার জন্য করি? সব তোমাদের জন্য। সেদিন বুঝতাম না বাবা, তবে এখন বুঝি টাকা রোজগার করা কতোটা কষ্টের। সৎপথে প্রতিটি টাকা রোজগারের পিছনে কি পরিমাণ কষ্ট লুকিয়ে থাকে? কি পরিমাণ পরিশ্রমের পর টাকা রোজগার করতে হয়। আর সেখান থেকে সংসারের সব খরচ, আমাদের পড়াশুনা শেষে দুটো টাকা ঐ আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জমা রাখা কতোখানি কষ্টকর তা এখন বুঝি বাবা।

তবে একটা মজার ব্যাপার কি, বাবা? তুমি যেদিন আমাকে বলতে অমুক সাহেবের মেয়ে কিংবা তমুক সাহেবের ছেলে সারাদিন পড়াশুনা করে সেদিন কিংবা তার পরের বেশ কয়েকদিন আমি কয়েকজন বন্ধুসহ হাতে বেশ মোটাসোটা গোছের বই নিয়ে ঐ অমুক কিংবা তমুক সাহেবের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করতাম। এতে করে অমুক কিংবা তমুক সাহেবের চোখে এ দৃশ্য পড়তো। এতে বেশ কাজ হতো। গোপন সূত্রে খবর পেতাম ঐ অমুক-তমুক সাহেবও নাকি তার ছেলে কিংবা মেয়েকে বলতো অমুক সাহেবের ছেলে দেখলাম বই খাতা হাতে নিয়ে কলেজ টিউশুনিতে সারাদিন ছুটছে। তাদের পড়াশুনার প্রতি কতো আগ্রহ! আর আমার ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনায় ঠেলে ধাক্কিয়েও বসানো যায় না।

এসব ভেবে বন্ধমহলে খুব হাসাহাসি হতো। আরো কিছুদিন যাবার পর বুঝতে পারলাম- এটা আসলে একটা জাতীয় সমস্যা। প্রায় সব পরিবারেই এসব হয়ে থাকে । আর একটা গোপন ব্যাপারতো তোমাকে বলিইনি। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, ক্লাস নাইনে পড়ার সময় স্কুল পালিয়ে ক্রিকেট খেলতে দেখে একদিন আমাকে মাঠ থেকেই বাড়িতে ধরে এনে বেধড়ক পিটিয়েছিলে। ক্রিকেটের ব্যাট দিয়ে আমার হাতে মেরেছিলে। আঙ্গুলগুলো প্রায় ভেঙ্গে যাবার মত হয়েছিলো। সাথে আমার ক্রিকেটের ব্যাট-স্ট্যাম্প সব আগুনে পুড়েছিলে। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছিলো। ঐ হাত নিয়েই তোমার উদ্দেশ্যে একটা চিরকুট লিখেছিলাম সেদিন।  মাঝে সেই চিরকুট খুলে পড়ি আর হাসতে হাসতে আমার পেটে খিল ধরে যায়। কি ছিলো সেই চিরকুটে লেখা জানো? চিরকুটে লেখা ছিলো- “ আমার বন্ধু দের সাথে স্কুল পালিয়ে ‘মনের মাঝে তুমি’ সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। সিনেমা দেখার চেয়ে ক্রিকেট খেলা অনেক ভালো। এখন থেকে প্রতিদিন স্কুল পালাবো। দেখি, কতো মারতে পারেন? স্কুল আমি পালাবোই। মরে গেলেও পালাবো। ”

আমি অবশ্য তার আগে থেকেই স্কুল পালাই। সেই ঘটনার পরও অনেকবার পালিয়েছি। সে কথা তুমি জানতেনা। কারণ, চোরতো আর প্রতিদিন ধরে পড়ে না। এভাবে অসংখ্য ঘটনা আমার মাথায় ইদানিং খুব ঘুরপাক খায় বাবা। যতবার আমি আমার শৈশব-কৈশোর ফিরে পেতে চাই ততবারই আমি তোমার শাসনকে খুব মিস করি, বাবা । জানো বাবা, সমুদ্রের কাছে আসলে মনটা অনেক বড়ো হয়ে যায়। আপনা আপনি দুহাত প্রসারিত হয়ে যায়। তবে আমিতো সমুদ্র অনেকবার দেখেছি, আমার কাছে তোমার চেয়ে বড় কোনো সমুদ্র নেই, বাবা। তোমার চেয়ে বড় কোনো বিশালতা আমার চোখে ধরা পড়েনি, বাবা। তুমি আমার ভালোবাসার সমুদ্র।তুমি আমার সমুদ্রের নীল জল। স্বপ্নের পথে তোমার হাত ধরে পাড়ি দিতে চাই সুদীর্ঘ পথ। এই ছোট্ট জীবনের পথ চলায় তোমাকে কতই না ভুল বুঝেছি। কতোই না কষ্ট আর ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে আমার জন্য। মাঝে মাঝে মনে হয় তোমাকে স্যরি বলি। কখনোতো সে কথাও মন খুলে বলতে পারিনি। আবার পরক্ষণেই মনে হয়- তোমাকে কেনো স্যরি বলবো? তোমাকে তো সরি বলার প্রয়োজন নেই। তুমিতো  সমুদ্র। সেখান থেকে এক ফোটা জল নিলে সমুদ্রের কি এমন ক্ষতি হয়? সমুদ্রের বিশালতার কি এমন ক্ষতি হয়?

মনের গহীন ভেতর লুকিয়ে রাখা ভালোবাসার নীল জলের কি এমন কমতি হয়? তুমি সব ভুলে গেছো, সব কষ্টকে করেছো দূর। কোনো কিছুই মনে রাখোনি। মনে রাখতে পারোনি। কারণ তুমি বাবা। তোমাকে নিয়ে আমার লিখা শেষ হবেনা, বাবা। কোনোদিন না। তোমার ভালোবাসার বিশালতাকে এই কাগজ কলমে বন্দী করা সম্ভব নয়। তোমার কথা হয়তো আর লিখা হবেনা কিংবা লিখতে পারবোনা। লিখার প্রয়োজনও হয়তো পরবে না। কারণ, আমিইতো বাবা। আমার ভেতরেই তো বাবা আছে।

এই চিঠিটাও হয়তো তোমার কাছে পৌঁছাবে না। মানে, আমি পাঠাতে পারবোনা। নিজের কাছেই থাকবে। হয়তো বার বার পড়বো। আর মনের অজান্তে অসংখ্য বার কাঁদতে কাঁদতে বলবো- বাবা, তোমাকে খুব ভালোবাসি। তোমাকে খুব ভালোবাসি, বাবা। খুব ভালোবাসি ।

ইতি
তোমার ছেলে

রাহিন শাফায়াত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*