ব্রেকিং নিউজ
Home | সাহিত্য পাতা | প্রতিবেশিনী

প্রতিবেশিনী

151

কাফি কামাল : ভৌতিক অন্ধকারের হৃদয় চিরে ছুটছে ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস। উড়িষ্যার পাথুরে পাহাড়ের পা ছুঁয়ে। চিল্কা লেকের ঠা-া হাওয়া এসে ঝাঁপটা দিচ্ছে নাকে মুখে। বাতাসের শো শো শব্দের সঙ্গে পাখির ডানা ঝাঁপটানি ভেসে আসছে পাশের কেয়াবন থেকে। দুই বগির মধ্যখানে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে নোমান। বেসিনের উল্টোপাশে হেলান দিয়ে। পাশেই এজমালি টয়লেট। ঘুম ভাঙা যাত্রীরা ঢুকছেন আর বেরুচ্ছেন। কেউ কেউ আসা যাওয়ার পথে কুঁতকুতে চোখে তাকাচ্ছেন তার দিকে। মনে অস্বস্তি ঢেউ তুললেও তাদের তীর্যক চাহনিকে গায়ে মাখছে না নোমান। সে তো আর অনাহূত কেউ নয়। টিকেট কাটা বৈধ যাত্রী। আসন নির্দিষ্ট না এটুকুই ব্যবধান। স্ট্যান্ডিং প্যাসেঞ্জার।
কন্যাকুমারী শব্দটি কয়েক বছর ধরে নোমানের মনে তৈরি করেছে এক অন্যরকম কৌতূহলের ঘোর। বিশাল ভারতের দক্ষিণবিন্দু। বামে নীল বঙ্গোপসাগর, ডানে ঘোলা আরব সাগর আর মুখোমুখি গাঢ়নীল ভারত মহাসাগরের জল। অফুরন্ত হাওয়ার উৎস। দিনের পর দিন মানচিত্রে চোখ রেখে কন্যাকুমারীর ত্রিসমুদ্রের জলে পা ভেজানোর স্বপ্ন দেখেছে। কিন্তু অদ্ভুত এক আলসেমির জালে বাঁধা পড়েছিল সে। হয় তো হয় না, মেলে তো মেলে না মওকা।
অবশেষে গ্রীষ্মের এক পড়ন্ত বেলায় ভারতীয় ভিসাযুক্ত পাসপোর্টটি হাতে এল। গুলশান থেকে হাতিরঝিল প্রকল্পের ধুলো ওড়া রাস্তা দিয়ে নোমান যখন কাওরান বাজার ফিরছিল তখন তার মনে হচ্ছিল সে ছুটছে কন্যাকুমারী পানে। হাতিরঝিলের কালো জলে ফুটছিল আরব সাগরের ধূসর শরীর। দুর্গন্ধময় বাতাস তার নাকে মুখে বইয়ে দিচ্ছিল ভারত মহাসাগরের লোনা ঘ্রাণ। অফিসে ঢুকেই সে ডুব দিয়েছিল অন্তর্জালে। ধ্যানে বসেছিল কন্যাকুমারীর। ঠিক পরদিন রাতে সে চড়ে বসেছিল সীমান্ত অভিমুখী বাসে।
কলকাতায় পা রেখে নোমানের মনে হয়েছিল তাকে বোধয় শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো স্বপ্নভঙ্গের বিষে নীল হয়ে ফিরতে হবে। কী বেদনা! বাল্যকালের রচনাশিক্ষার মতো। একটি টিকিট পেলে কি করতাম জাতীয় ভাবনায় সে ছুটেছে মার্কুইজ স্ট্রিট থেকে হাওড়া জংশন। মেলেনি। আলসেমির জাল ছেঁড়ার মতো শেষে দুধের স্বাদ মেটাতে সে চড়ে বসেছিল পুরী এক্সপ্রেসে। কিন্তু সহযাত্রী দম্পতির মনোকামনা আর কটক থেকে ভুবনেশ্বরের পথে অভূতপূর্ণ এক দৃশ্য তার ঘোলের স্বাদ তেতো করে দিল। আ-া বাচ্চা থেকে হাড়পাকা বুড়ো। ইলেকট্রিকের তারে বসা সারিবদ্ধ কাকের মতো বসে আছে ত্যাগ স্বীকারে। সেই থেকে নোমানের শরীর গুলিয়ে আসছে। কিন্তু ইমোটিলের প্রতিরোধে তা সুনামির মতো বেরিয়ে আসতে পারছে না। মাঝসমুদ্রে ঘোরপাক খাচ্ছে। জগন্নাথের মন্দির পেছনে ফেলে পুরীর সৈকতে পা রাখতেই ফের কন্যাকুমারী আকুল আহ্বানে জানালো নোমানকে। সৈকতের ভেজা বালিতে লেখা স্ত্রী-কন্যার নামগুলো যখন বঙ্গোপসাগরের ঢেউ এসে মুছে দিল তখনই তার মনে হলো, হোক তবে নয়াযাত্রা শুরু। পুরীর বুকিং কাউন্টারগুলো তন্নতন্ন করেছে। কিন্তু নেহি, নেহি জবাবের ভেতর দিয়ে তার জেদ যেন জগন্নাথের মূর্তি বনে গেছে। হোক না ঠুটো। খোরদা জংশনে বয়সী নায়িকার মতো টিকিট মাস্টারণীর মুখেও নেহি শব্দটি তার কানে বাজছিল হিন্দি সিনেমার গানের মতো। নায়িকা লজ্জায় না না করে পালাচ্ছে আর পেছনে পেছনে নাছোড়বান্দার মতো ছুটছে নায়ক। সিনেমায় যেমন অবশেষে নায়িকা ধরা দেয়, তার বাবা হবু জামাইকে শর্ত দেয়; তোমাকে কিন্তু পরিশ্রম করে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। অনেকটা তেমনই। পেতে চাইলে একটিই উপায়, যেতে হবে দাঁড়িয়ে। খোরদা থেকে চেন্নাই। বিশ ঘণ্টার জার্নি। নায়ক যেমন নায়িকাতে পেতে সকল শর্ত মেনে নেয় তেমনই নোমান খাড়াযাত্রা কবুল করেছে। কিন্তু সেসব এখন পুরোনো গল্প। ছুটন্ত ট্রেনের মতো পেছনে ফেলে আসা। এখন সে ব্রহ্মপুর পেরিয়ে গোলকুণ্ডা-কোট্টাভালসার উঁচু পাহাড়, ঘনজঙ্গলের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে কন্যাকুমারীর বাড়ি।

পিঠে বিশ কেজি ওজনের ব্যাগ নিয়ে কতক্ষণ আর দাঁড়িয়ে থাকা যায়। এতক্ষণ কিছু সহযাত্রী ছিল সিঁড়ি ও টয়লেটের আশপাশে। মধ্যরাতে তারা নেমে পড়েছে ব্রহ্মপুর স্টেশনে। পিঠের ব্যাগটাকে বড্ড বিরক্তিকর মনে হচ্ছে। কিন্তু বিদেশ বিভূঁইয়ে এটুকু কষ্ট ভোগ না করে উপায়ই বা কি। এ তো ঢাকা-চট্টগ্রাম নয় যে এককাপড়ে ঘুরে আসা যায়। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ধীরে ধীরে তার শরীরের কলকব্জাগুলো ঢিলে হয়ে আসতে শুরু করেছে। কোথাও একটু বসতে পারলে ভাল হতো। নোমান কয়েকবার টিটিকে ভাও করার চেষ্টা করেছে। হিন্দুস্তানের লোকগুলো যেন রাম রাম-এর বদলে নেহি নেহিই জপ করে সর্বক্ষণ। ঘড়ির কাঁটায় রাত যখন তিনটে পনেরো, তার চোখ দুটো যখন ঘুমে ঢুলুঢুলু তখনই একটি মেয়ে এসে ঢুকলো টয়লেটে। নোমানের চোখ পড়ল। কিন্তু কয়েক মিনিট পর মেয়েটি বেরিয়ে থমকে দাঁড়াল সিঁড়ির মুখে। নিঃশব্দে একবার ঘনদৃষ্টি ফেলে দেখল নোমানকে। পরমুহূর্তে তার উল্টো পাশের সিঁড়ি মুখে গিয়ে দাঁড়াল। মেয়েটির ওড়না উড়ছে ধেয়ে আসা বাতাসে। মধ্যরাতে ঘুমন্ত যাত্রীর মতো আলো-আঁধারী পুরো বগি। কম পাওয়ারের একটি লাইট জ্বলছে এ সিঁড়িমুখ ও টয়লেটের সামনে। ম্লান আলোয় পেছন থেকে মেয়েটিকে খেয়াল করে দেখল নোমান। তারই সমান উচ্চতা, সিøম ফিগার, উজ্জ্বল শ্যামলা রং, দীঘল কালো চুল, স্ফিত পশ্চাৎ ও উন্নত বক্ষদেশ। সুন্দরীর সনদটি স্বাক্ষরিত না হলেও আকর্ষণীয়া সনদটি ততক্ষণে তাকে প্রদানে প্রস্তুত। কিন্তু নোমান মনে মনে ভাবছে মেয়েটির বুকের মধ্যেও কি তার মতো হাহাকার। গভীর রাতে দূরন্ত গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের সিঁড়িমুখে ধেয়ে আসা বাতাসে বুক ঠেকিয়ে ভেতরের হাহাকারকে শান্ত করছে! মাত্র কয়েক মুহূর্ত। ফের নোমানের দিকে একপলক তীর্যক দৃষ্টি ফেলে মেয়েটি ঢুকে গেল বগির আলো-আঁধারি জগতে। হয়তো সে নিজের সিøপিং সিটে শুয়ে পড়বে। হয়তো কাত হয়ে বসে চোখ মেলে দেবে মুহুর্মুহু অতিক্রান্ত বাইরের আলো-অন্ধকারে। কে জানে। নোমান বারকয়েক এ সিঁড়ি ও সিঁড়ি পায়চারী করল। ব্যাগের সাইড পকেটে রাখা পানির বোতলটি বের করে চোখে মুখে ঝাঁপটা দিল। ব্রহ্মপুরের পর স্টপিজ না থাকায় তার মতো স্ট্যান্ডিং প্যাসেঞ্জারের গাদাগাদিও নেই। আপাতত সে একাকি। কিন্তু একা একা ভাল লাগছে না। একটু পর চোখের পাতা দুটো মশহুর প্রেমিকের মতো মিলিয়ে আসতে শুরু করল। মেয়েটি আরও কিছুক্ষণ দাঁড়ালে ভালো হতো। ক্লান্তিটা এভাবে জেঁকে ধরতো না। বিরক্ত করতো না ঘুমও। সে যেন গরল খাওয়া মানুষের মতো। ঘুমোনো যাবে না। একবার ঘুমানো মানেই চিরতরে ঘুমিয়ে পড়া। তাই গুনগুনিয়ে গান ধরল। বাতাসের শো শো আর ট্রেনের রিমিক ঝিমিক শব্দ মিলে অন্যরকম একটা সুর। শেষ পর্যন্ত গানই তাকে চাঙ্গা করে রাখল। খালি পানির বোতলটি জানালার সঙ্গে মৃদু বাজাতে বাজাতে কেটে গেছে দীর্ঘক্ষণ। হঠাৎ থামল ট্রেন। যাত্রী শূন্য দীর্ঘ এক প্লাটফর্মে। নোমানের মনে হলো এ এক অলৌকিক অচিনপুর। ট্রেন ছেড়ে দেয়ার একমিনিটের মধ্যেই মেয়েটি ফের বগি থেকে বেরিয়ে এল। এবার একা নয়, মাকে সঙ্গে নিয়ে। প্রথমে মা, পরে বেটি। এ অল্প সময়ের মধ্যে তার সঙ্গে দু’বার চোখাচোখি হলো। দ্বিতীয়বার মনে হলো মেয়েটির দৃষ্টিতে কৌতূহল খেলা করছে। ব্যাস এটুকুই। ভোরে। সূর্য তখনও বাইরে বেরুবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশাখাপত্তম জংশনে থামল ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস। আধো ক্লান্তির ঘুম আধো জেদের জাগরণে তখনও সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়েছিল নোমান। কিন্তু তাকে অনেকটা ধাক্কা মেরেই প্ল্যাটফর্মে নেমে গেল দুজন। হাতে পেস্ট লাগানো ব্রাশ, কাঁধে তোয়ালে। ঘাড় বাঁকিয়ে দেখল ঘুম ভাঙা যাত্রীদের ঢল আসছে সিঁড়ির দিকে। তাদের জায়গা করে দিতে কিংবা ভারি ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ধাক্কা থেকে বাঁচতে সেও প্ল্যাটফর্মে নামল। পাশেই বাঁধানো বেসিন। হাত মুখ ধুয়ে দাঁড়িয়েছিল ঠিক সিঁড়ির কাছেই। নাস্তার ঠোঙ্গাটি দ্রুত শেষ করে একবোতল পানি কিনছিল। খুচরো টাকা গুনতে গুনতেই ভেঁপু বেজে উঠল। হুড়মুড়িয়ে যাত্রীরা ঢুকে পড়ছে চলন্ত বিশাল যান্ত্রিক অজগরের পেটে। নোমান বগিতে উঠেই এক চক্কর চোখ বুলিয়ে নিল। কোনো সিট যদি হয়ে থাকে। কিন্তু নোমানকে অবাক করে দিয়েই যেন এক্কেবারে দরজার পাশের সিটটা খালি পড়েছিল। আশপাশে কোনো ব্যাগও নেই। নোমান সিটে গিয়ে বসতেই দ্বিতীয়বারের মতো অবাক হলো। উল্টোপাশের আসনে বসে আছে সেই মেয়েটি ও একজন বয়সী পুরুষ মানুষ। সম্ভবত মেয়েটির বাবা। মেয়েটির সঙ্গে বার কয়েক চোখাচোখি হলো। এরই মধ্যে একবার বয়সী পুরুষটি পেছনের সিটে বসা দুইজন মহিলার জন্য বেয়ারাকে চায়ের অর্ডার দিল। মেয়েটিও ঘাড় বাঁকিয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলল। পেছনের আসনের বয়সী মহিলাটি ঔষুধের কৌটা খুঁজতে খুঁজতে সুলতানা বলে ডাক দিল। মেয়েটির নাম সুলতানা! না চাইতেই জানা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সাদা উর্দি পরা একটি ভুঁড়ি এসে নোমানকে তাড়া দিল। সে কোন মানুষ নয়, দেখতে পেল ঢোলের মতো একটি ভুঁড়ি। মুখের দিকে তাকাতেই টিটি বলল, হঠো। নোমান বুঝতে পারল আসনটি টিটির। সে উঠে দাঁড়াতেই মেয়েটি তার দিকে তাকাল। ভেতরে ভেতরে লজ্জা উঁকি মারছে। কিন্তু বিদেশ ভূঁইয়ে লাজ-লজ্জায় কি আসে যায়। সে একটা ডেমকেয়ার ভাব নিয়ে দরজার দিকে পা রাখতেই কানে এল, হ্যালো। নোমান ঘাড় ফেরাতেই মেয়েটির বাবা হিন্দিতে বলল, তোমার সিট নেই?

নোমান কি বলবে। সারাটা রাত দাঁড়িয়ে এসেছে। আজ পুরোদিন শেষে রাতে গিয়ে পৌঁছাবে মাদ্রাজ। স্টান্ডিং টিকিট। দাঁড়িয়েই যেতে হবে। কেবল কন্যাকুমারীর টানে সে এমন অবিবেচকের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘না’ সূচক মাথা নাড়াল নোমান। লোকটি ফের প্রশ্ন করল, কোথায় যাবে? নোমান ছোট্ট করে উত্তর দিল, মাদ্রাজ। ওরে, বাপরে। সে রাত থেকে দেখছি তুমি দাঁড়িয়ে আছ। মাদ্রাজ পৌঁছতে তো রাত হবে। ততক্ষণ তুমি দাঁড়িয়ে থাকবে কি করে? লোকটি এক নাগাড়ে বলে গেল। মেয়েটিও নোমানের মুখের দিকে তাকিয়ে যেন নীরবে বিস্ময় প্রকাশ করছে। নোমান ম্লান হাসল। লোকটি একটু ঘন হয়ে বসে তার আসনে একটু জায়গা করে দিয়ে বলল, ইয়াত বহক। নোমান বুঝতে না পেরে তার মুখের দিকে তাকালে লোকটি হিন্দিতে বলল, এখানে বসে একটু বিশ্রাম নাও। বৃষ্টি না চাইতেই জল পাওয়ার মতো অবস্থা। নোমান ব্যাগটি সিটের নিচে রেখে সলজ্জ মুখে মানুষটির পাশে বসল। ছোট্ট করে থ্যাঙ্ক ইউ বলতেও ভুলল না। ট্রেন ছুটছে একেরপর এক তাল অরণ্যের বুক চিরে। চারদিকে তালগাছ আর তালগাছ। তালবন নয়, বলা যেতে পারে তালজঙ্গল। ছোট্ট বেলায় তালশাঁস খাওয়ার স্মৃতি ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। দুই বিচি আটআনা, তিনবিচি এক টাকা। নোমান তখন দুইবিচির তাল চাইত। দুইয়ে দুইয়ে চারবিচি একটাকা। এক বিচি বেশি। আর জগদানন্দ বড়–য়া দুইবিচির কথা বলে তিনবিচির তাল কেটে একটাকা নিত। নোমানের তালস্মৃতির জাল ছিঁড়ে লোকটি জানতে চাইল, তোমার বাড়ি কি ওয়েস্ট বেঙ্গল? না, বাংলাদেশে। বাংলাদেশ! লোকটির গলায় প্রশ্ন ও বিস্ময়ের স্বর। নোমানকে অবাক করে দিয়ে লোকটি বাংলায় বলল, কিন্তু তুমি এতক্ষণ হিন্দিতে কথা বলছ কেন? আপনি হিন্দিতে প্রশ্ন করেছেন, আমি তাই হিন্দিতে উত্তর দিলাম। এবার ময়মনসিংহের আঞ্চলিকতার টান মেশানো বাংলায় বলল, আমাদের পূর্বপুরুষ ছিল ময়মনসিংহের লোক। আমার দাদার বাবা ময়মনসিংহ থেকে নগাঁও সেটেল করেছিলেন। নোমান আগে কখনও নগাঁওয়ের নাম শোনেনি। সে বলল, এটা কি ওয়েস্ট বেঙ্গলে? না, আসামে। ওহ্! আচ্ছা। তোমার নাম কি, কি করো? জ্বি, আবু নোমান, একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। আমি আবদুর রাজ্জাক, একটি স্কুলে পড়াই। নোমান বাংলাদেশী জেনে লোকটি খুব আগ্রহের সঙ্গে পূর্বপুরুষের দেশ নিয়ে কৌতূহল প্রকাশ করছে। নোমানের জানা হয়ে যাচ্ছে, লোকটির দাদার বাবা ছিলেন কৃষক। দাদা ছিলেন শ্রমিক। বাবা দোকানদার আর তিনি স্কুল শিক্ষক। তার দুই মেয়ে এক ছেলে। পেছনের আসনে বসেছেন তার স্ত্রী, বড় মেয়ে ও মেয়ের জামাই। পাশের মেয়েটির দিকে ইশারা করে বললেন, আমার ছোট মেয়ে সুলতানা নাজিমা। মাদ্রাজ যাচ্ছি স্ত্রীর চিকিৎসা ও মেয়ের ভ্রমণের অঙ্গিকার পূরণ করতে। মেয়েটি এবার অনার্স ফাইনাল দিয়েছে। লোকটি যখন গল্প করছে তখন বারবার নোমানের সঙ্গে চোখাচোখি হচ্ছে সুলতানার। বড্ড চুপচাপ মেয়ে। এতক্ষণ ধরে নোমান তার বাবার সঙ্গে কথা বলছে কিন্তু একটি শব্দও বের হয়নি তার মুখ থেকে। নোমান সহৃদয় ভদ্রলোকটির সঙ্গে কথা বলছে মুখে কিন্তু তার চোখ বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে মেয়েটির মুখম-লে। রাতে ড্রিম লাইটের আলোতে যেমনটি দেখেছিল দিনের বেলায় তার চেয়ে কিছু বেশি সুন্দরই মনে হচ্ছে। নোমান খেয়াল করল সুলতানার সঙ্গে চোখাচোখির ব্যাপারটি লোকটির চোখে পড়েছে। এক মুহূর্ত সে মরমে মরল। কিন্তু লোকটি তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। লতার মতো মাচানের এ কঞ্চি থেকে ও কঞ্চিতে লতিয়ে উঠছে তার গল্প। লোকটি বলল, তুমি কি আগেও ভারতে এসেছ? নোমান বলল, এবারই প্রথম। আবদুর রাজ্জাক বলল, মাদ্রাজ কোথায় যাবে? নোমান সংক্ষেপে জবাব দিল, আসলে আমি যাব কন্যাকুমারী। ওরে বাপ! ও তো বহুদূর। এক্কেবারে শেষপ্রান্তে। সেখানে কি কোনো কাজে যাচ্ছো, নাকি? নোমান বলল, কোনো কাজ নেই। বেড়াতেই যাচ্ছি।

আবদুর রাজ্জাক বলল, তোমাকে রাত থেকেই খেয়াল করেছি। বাংলাদেশ থেকে এসেছ এবং এত লম্বা জার্নি করবে জানলে আগেই ডাক দিতাম। একটু শেয়ার করলে তোমার কষ্ট কমতো। নোমান বিনয়ী হয়ে বলল, এখন যে বসতে দিয়েছেন এটাই তো বিশাল। আমি তো জেনে বুঝেই ট্রেনে চড়েছি। সুলতানা মনোযোগ দিয়ে শুনছে বাপের সঙ্গে ভিনদেশী ছেলেটির গল্প। এক ফাঁকে তিনসিটের বয়স্ক অন্যযাত্রীটি টপ সিøপারে উঠে শুয়ে পড়ল। যে এতক্ষণ নোমান ও সুলতানার বাবার মধ্যখানে বসে ঝিমুচ্ছিলেন। যার কারণে আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে গল্প করতে নোমানকে একটু ঝুঁকে বসতে হয়েছিল। বিশাখাপত্তমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার সময় নোমানের চোখে পড়েছিল বেশিরভাগ জানলায় আটকানো রয়েছে ছোট ছোট শিকল। কিন্তু সিটে বসে সে খেয়াল করল ওইগুলো আসলে যাত্রীদের ব্যাগের সঙ্গে আটকানো। বুঝতে পারল, দীর্ঘপথের যাত্রীরা ঘুমোবে, টয়লেটে যাবে, প্ল্যাটফর্মে নামবেÑ ব্যাগের কথা খেয়ালই থাকে না। শেকলে বেঁধে না রাখলে চুরি হতে পারে। কিন্তু নোমানের মনে হচ্ছে লোকটি কি মেয়েকে সে দৃষ্টির শেকল দিয়ে আটকে রাখবে নাকি। কিন্তু সেটা করেনি লোকটি। কিছুক্ষণ পর দূর পাহাড়ের শীর্ষদেশে একটি মন্দির দেখে সে ক্যামেরাটি অন করল। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে রডের দিকে ঝুঁকে ভিডিও অন করল। মোবাইলের ক্যামেরা। চলন্ত ট্রেনে বসে দূর থেকে মন্দিরটি স্পষ্ট ধরা না দিয়ে পরিবেশটি বেশ সুন্দর আসছে। নোমানকে ভিডিও করতে দেখে আবদুর রাজ্জাক বলল, তুমি কি জানালার পাশে বসবে? এতক্ষণ জানালার পাশেই বসেছিল মেয়েটি। নোমান মৃদু আপত্তি জানালেও ততক্ষণে ভেতরের দিকে একটু সরে বসে মেয়েটি। সে একটু ইতস্তত করলে আবদুর রাজ্জাক বলল, তুমি আমাদের দেশে বেড়াতে এসেছ। ছবি টবি তুলবে। আমাদের অসুবিধা হবে না তুমি জানালার পাশেই বস। সঙ্কোচের সঙ্গে জানালার পাশে বসল নোমান। এখন তার ডানপাশেই সুলতানা। নোমান সতর্ক হয়ে সুলতানার শরীর থেকে দূরত্ব থাকতে চাইলেও তার কোনো সঙ্কোচ নেই। তাই ট্রেনের দুলুনি ও নড়াচড়ায় বারবার তার শরীরের স্পর্শ বিদ্যুতের মতো শিহরণ জাগায় নোমানের শরীরে। এখন তার নিজেরই মনে হচ্ছে ছবি তোলাটা ছিল বাহানা। প্রকৃতিই যেন তাকে টেনে নিয়ে গেছে জানালার পাশে সুলতানার স্পর্শে। সুলতানা এখন তার ডান উরুর প্রতিবেশী। যদ্দুর চোখ যায় ঘন সবুজ ঝোঁপ। চিকন চিকন লম্বা ডাল, চিরল চিরল পাতা। আনমনে তাকালে মনে হয়, যেন কেউ বিছিয়ে দিয়েছে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ চাদর। উঁচু উঁচু পাহাড়গুলো দেখে ধ্যানী সাধুর মতো লাগে। এক নয়, দুই নয় সাধুর সারি। সাধুর কণ্ঠমালার মতো পাহাড়গুলোতে উঠে গেছে সিঁড়ি। চুলের ঝুঁটির মতো মন্দির। নোমানের মোবাইলের ম্যামরি স্ফীত হচ্ছে। শুকনো একটি পাহাড়ি নদী দেখে তার ডলু নদীর কথা মনে পড়লো। তার গ্রামের নদী। যার পানিতে ঝাপাঝাপি আরও বালুচরে খেলতে খেলতে কেটেছে শৈশব। এতক্ষণ নোমান ও আবদুর রাজ্জাকের মধ্যখানে বসেছিল অন্য একটি লোক। এবার তার জায়গা নিয়েছে সুলতানা। কিন্তু এখন ঝুঁকে কথা বলতে ভালই লাগছে নোমানের। বারবার সুলতানার দিকে তাকানো যাচ্ছে। আর গল্পের ভেতর দিয়ে ডিব্রুগড় এক্সপ্রেস অতিক্রম করেছে একে একে হামসবারাম, তিম্মাপুরম, পিতাপুরম। রাজমুন্দ্রী জংশনে ট্রেন থামলে সুলতানা ওঠে মায়ের কাছে গেল। নোমান ভাবল, এবার নিশ্চয় সে আর ফিরে পাশে বসবে না। কিন্তু ঘটলো উল্টো। রাজমুন্দ্রী জংশনে ট্রেন থামার পর টপ সিøপার থেকে নেমে এল অন্য লোকটি। যথারীতি সে মধ্যখানেই বসে পড়ল। তখন একটি ছেলে বগিতে উঠে খালি আসনের সন্ধান করছিল। হঠাৎ টিটি খপ করে তার হাতটি ধরে ফেলল। তারপর দুইজনের মধ্যে শুরু হয়ে গেল কথাকাটাকাটি। দুইজনই কথা বলছে কিন্তু তাদের একটি শব্দও ধরতে পারছে না নোমান। কেবল পাথর টোকাটুকির মতো শব্দ বাজছে যেন তার কানে। টিটির দিকে নোমানের মনোযোগ দেখে সুলতানার বাবা প্রশ্ন করল, কিছু বুঝতে পারছো? জ্বি না, এটা কোন ভাষা? নোমানের পাল্টা প্রশ্ন। সুলতানার বাবা হেসে বললেন, তেলেগু। নোমানের মনে পড়ল অন্ধ্রপ্রদেশের ভাষা তেলেগু। তাহলে নিশ্চয় আজ্জুও তেলেগুতে কথা বলে। ভারতের সাবেক অধিনায়ক আজহারউদ্দিন নোমানের পছন্দের ব্যাটসম্যান ছিল। ক্রিকেটের কথা উঠলেই তার কব্জির মোচড়ে খেলা শটগুলো চোখে ভাসে। কিন্তু যে লোকটি খেলার মাঠে সহজে ভুল সিদ্ধান্ত নিতেন না তিনিই বাস্তব জীবনে ভুলের ঘুর্ণিজালে জড়িয়ে পড়লেন। কি ভাবছো? সুলতানার বাবা প্রশ্ন করলেন। নোমান বলল, আজহারউদ্দিনের কথা। সুলতানার বাবা প্রথমে বুঝতে পারেনি। তাকে বুঝাতে গিয়ে গল্প মোড় নিল ক্রিকেটে। মধ্যখানে বসা লোকটি এক্কেবারে নিশ্চুপ। নোমান গল্প করছে মুখে, কিন্তু তার চোখ অন্ধ্রের প্রকৃতি ভোগে মগ্ন। ট্রেন যতই সামনে ছুটছে ততই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। পাথুরে, লালচে, মেটে, কালচে, ধূসর আর বেলে মাটি বিচিত্র ভূমি। মাইলের পর মাইল জুড়ে তাল-নারকেল বাগান, বাবলা ঝোঁপ, বিচিত্র পাখি আর মহিষের পাল। বাগানে বাগানে তুলসি ম-প। নোমানের মনে হচ্ছে, যদি এখানে কিছুদিন বেড়ানো যেত। পরক্ষণে তার মনে পড়ল ছুটির তিনদিন কেটে গেছে। মাত্র একসপ্তাহ সময় এখন তার হাতের মুঠোয়। এ ছুটির কথা মনে পড়তেই তার গলা দিয়ে একটি তেতো ঢোক নেমে গেল। কিছুক্ষণ পর সুলতানার বাবা টপ সিøপারে চড়ে বসলে সিটটা খালি হলো।

একটু পরে ফিরে এল সুলতানা। লোকটি বসেই ছিল। কিন্তু সুলতানা ইশারায় লোকটিকে সরে বসতে বলল। লোকটি কোনো বাক্যব্যয় ছাড়াই সরে গেলে সুলতানা ফের নোমানের পাশে এসে বসল। তার পিছু পিছু সে বগিতে একটি বাচ্চা ছেলে এসে ঢুকল। মাথায় কাপড়ের ঝুমঝুমি লাগানো টুপি। মুখে কাজল দিয়ে আঁকা গোঁফ। নেচে নেচে সে নানা ভঙ্গি করছে। আরেকটি ছেলে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে যাত্রীদের দিকে। নোমান একটি দশরুপির নোট দিল ছেলেটির হাতে। তখন তার দ্বিধরনের ঘোর। বাইরে অদ্ভুত ঘোর সৃষ্টিকারী বাবলা কাঁটার ঝোপ, ভেতরে নিশ্চুপ পার্শ্ববর্তিনী সুলতানা। হঠাৎ তালপাতার চাউনি দেয়া ছোট্ট একটি কুঁড়েঘর দেখে প্যান্টের ডান পকেট থেকে তড়িঘড়ি করে মোবাইলটি বের করতে যাচ্ছিল নোমান। এতে তার ডানহাত রীতিমতো ঘেঁষে গেল সুলতানার পেটের বামপাশ। নোমান একটি অপরাধবোধ নিয়ে তার দিকে ফিরতেই খেয়াল করল সুলতানার মুখে মৃদু হাসির রেখা। নোমান দ্রুত ভিডিও অপশনে গিয়ে কয়েকটি কুঁড়েঘরের দৃশ্যধারণ করল। যখন সে মোবাইলে ধারণকৃত দৃশ্যগুলো দেখছিল তখনই প্রথম মুখ খুলল সুলতানা। আহমদ ছফার ওঙ্কারের সে বোবা মেয়েটির মুখে ভাষা ফোটার মতো। দারুণ সুন্দর। নোমান কি ভুল শুনল। যেন পাথরের একটি মূর্তি হঠাৎ কথা বলে উঠল। সে সুলতানার দিকে তাকাতেই বলল, বাড়িগুলো খুবই সুন্দর তাই না। নোমান ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়ল। মূর্তির মুখের কথায় সে নিজেই যেন বোবা হয়ে পড়েছে। আপনাদের দেশে আছে এ রকম বাড়ি? নোমান বলল, এ রকম নেই। কিন্তু আমাদের দেশেও সুন্দর সুন্দর কুঁড়েঘর আছে। কি রকম? নোমান বলল, বাঁশ দিয়ে বানানো নকশী বেড়ার, কাঠ দিয়ে বানানো কারুকার্যময়, পাটখড়ির বেড়া ও সুপারি পাতার ছাউনি। তাই! সুলতানার কন্ঠে বিস্ময়, চোখে মুখে কৌতূহল। নোমান বলে, কখনও বাংলাদেশে গেছেন? সুলতানা বলল, দাদার কাছে গল্প শুনেছি। আমার বাবাও কখনো যায়নি। কিন্তু দাদার গল্প শুনে ছোট বেলায় থেকেই ইচ্ছা হতো পাখির মতো উড়ে যাই সে দেশে। বীরাঙ্গনা সখিনা, মহুয়া-মলুয়ার দেশে। মহুয়া-মলুয়ার নাম শুনে নোমান একটু অবাক হয়। সুলতানার পূর্বপুরুষ ছিলেন ময়মনসিংহের মানুষ। সুলতানার তিনপুরুষের জন্ম আসামে। শান্তির দেশ ভুটানের সীমান্ত এলাকায়। দেশ ভাগ হয়ে গেছে। কিন্তু তারা এখনও লালন করছে মহুয়া-মলুয়াকে। নোমান প্রশ্ন করল, আপনি তাদের গল্প জানেন? ছোটবেলায় দাদার কাছে শুনেছি। এখন যেতে ইচ্ছা করে না সেই দেশে? ময়মনসিংহ। ইচ্ছা তো করেই। কিন্তু সুযোগ যে মেলে না। তবে কোনো একদিন ঠিকই যাব। বিজয়বাড়া জংশনে ট্রেন থামতেই চারদিক থেকে বিরিয়ানির মৌ মৌ ঘ্রাণ এল। নোমান খেয়াল করল, কিছু যাত্রী হুড়মুড় করে নেমে গেল। সুলতানার দিকে তাকিয়ে সে বলল, একটু ঘুরে আসি। সে হাসিমুখে ঘাড় নাড়ল। ট্রেন ছাড়তেই সে উঠে আসে। তখনও তার জায়গাটি ফাঁকা। নোমান সেখানে বসতে বসতে সুলতানাকে ধন্যবাদ দিল। সুলতানা কেবল মৃদু হাসল। ডিব্রুগড় এক্সপ্রেসের সরবরাহকৃত খাবারের ওপর আস্থা রেখেছে সুলতানার পরিবার। দুপুরেও খাবারের অর্ডার দেয়ার সময় সুলতানা জিজ্ঞেস করল, আপনি কি ভেজ? না…। নোমান ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, অসুবিধা নেই; আমি নিজেই নিচ্ছি। সুলতানা গো ধরল, আপনি আমাদের দেশে অতিথি। আমাদের প্রতিবেশী দেশের মানুষ। প্রতিবেশী। আপাতত দুপুরে ট্রেনেই একসঙ্গে লাঞ্চ করেন। পরে আমাদের আসামে আপনার দাওয়াত থাকল। নোমান ভাবল, স্টান্ডিং টিকিট নিয়ে যাদের আন্তরিকতায় বসে যাওয়ার সুযোগ মিলল তাদের দাওয়াত কবুলে কি আর সঙ্কোচ। তবু বলল, একটি শর্ত আছে। শর্তের কথা শুনে সুলতানা একটি ঘাবড়ে গেল। তা দেখে নোমান বলল, তেমন কিছু না। বিকালের চা কিন্তু আমিই খাওয়াব। সুলতানা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ওহ্। এই কথা। ঠিক আছে, তাই হবে। বিজয়বাড়ার পর একটি কন্যাশিশুকে নিয়ে বগিতে এল এক তরুণী মা। তার হাতের আঙুলে আটকানো কাঠের টুকরোয় সুর তুলে সে গাইছে, ও মেরে হাম সাফার, এক ঝারা ইন্তেজার…। তরুণী মা’টির মতো সুলতানাও সে গানে কোরাস ধরল। গান শেষ হতেই নোমান বলল, আপনার গলা তো বেশ মিষ্টি! সুলতানা যেন একটু লজ্জা পেল। সামলে নিয়ে বলল, গাইতে ভাল লাগে।

গান দিয়ে শুরু হলেও গল্পের ডালপালা বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ভ্রমণের পাসপোর্ট, ভিসা, যোগাযোগ, খরচাপাতি, মৌসুম ময়মনসিংহের দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে ছোট ছোট প্রশ্ন করে সেগুলো আত্মস্থ করে সুলতানা। পূর্বপুরুষের দেশ। নাড়ির টান বলে কথা। নোমান বলল, পূর্বপুরুষের বাড়িই তো আপনার সবচেয়ে বড় দর্শনীয়স্থান। সুলতানা বলল, সে তো অবশ্যই। গল্পের মধ্যেই অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক সময়। ট্রেন পেরিয়েছে চিলিভোর, টিসুনতারা, মডুককরুর, চিনাগঞ্জপুর, আল্লুরু রোড স্টেশন। আল্লুরু রোড পেরিয়ে একদফা চা গিলল দুজনে। নেল্লোর অতিক্রমের সঙ্গে দেখা গেল ধানক্ষেত, কৃষ্ণচূড়া গাছসহ সবমিলিয়ে বাংলাদেশের মতোই দৃশ্যপট। সুলতানাকে ডেকে বলল, এই দেখুন বাংলাদেশ! সুলতানা অবাক হয়ে বলল, মানে। নোমান বলল, বাংলাদেশ দেখতে অনেকটা এই রকম। সবুজ ধানক্ষেত, ঘন গাছপালা, ছোট ছোট নদী আর জলাশয়ে ভরা। সুলতানা জানালার দিকে ঝুঁকে আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল নোমানের। চোখ মেলে দিল দূরদিগন্তে। সে যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে পূর্বপুরুষের না দেখা ময়মনসিংহে। সুলতানার বাবা টপ সিøপার থেকে নেমে টয়লেটে গেল। নোমান খেয়াল করল তিনি সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। সেটা দেখেই নোমান ওঠে গিয়ে তাকে বলল, প্লিজ এবার আপনি বসুন। আমি তো অনেকক্ষণ বসেছি। সুলতানার বাবা বলল, না না তুমিই বসো। তিনদিন ধরে ট্রেনে চড়ছি। কতক্ষণ আর বসে থাকতে ভালো লাগে। আর পথও বেশি নেই। তোমার তো লম্বা জার্নি। বরং তুমিই বসে একটু বিশ্রাম নাও। ট্রেনে ক্লান্ত হয়ে পড়লে ঘুরবে কি করে? তাই বলে, আপনি দাঁড়িয়ে থাকবেন? তিনি টিটির সিটের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, ওখানে শেয়ার করব। তুমি যাও বসো। আমার মেয়ের সঙ্গে বাংলাদেশ নিয়ে গল্প করো। সে বাংলাদেশের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। নোমান একটু বিস্মিত হলো। আবদুর রাজ্জাক কি আসলে হৃদয়বান? নাকি পূর্বপুরুষের দেশ বাংলাদেশের মানুষ জেনে সম্মান দেখাচ্ছে। কিন্তু যেভাবে নিজের অবিবাহিত মেয়ের পাশে বসতে দিয়েছে তাতে হৃদয়বানই মনে হচ্ছে। নোমান ফিরে গিয়ে জানালার পাশে বসল। সকালে প্রথমবার যখন বসেছিল তখন সুলতানার চোখে মুখে ছিল কৌতূহল। এখন জিজ্ঞাসা। প্রশ্নের খৈ ফুটছে মুখে- বলেন তো, বাংলাদেশে এটা কেমন; বলেন তো, বাংলাদেশে ওঠা কেমন। কক্সবাজার নামটি শুনছে সে। বঙ্গোপসাগরের উপকূলে। ডুবন্ত সূর্যের দিকে ইঙ্গিত করে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ও সুন্দরবনের গল্প শুনে সুলতানা যেন ঘোরের মধ্যে পড়ে গেল। নোমানের মুখরতা ও সুলতানার ঘোরের মধ্যে ট্রেন পেরিয়ে গেল বিদ্যাপালম, মনুভুল্লু, অঙ্গুল ও আরামাক্কুম। কে একজন বলল, অন্ধ্র শেষ, তামিল শুরু। চারদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে। দেখতে দেখতে জেঁকে বসল রাত। যাত্রীরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ কেউ বাক্স পেটারা নেড়ে চেড়ে দেখছে। নোমানের মনে বিচ্ছিন্নতার ঝড় বইছে, সুলতানার মনে ঝরছে বৃষ্টি। আর মাত্র ঘণ্টাখানেক। দুজনের পথ বাঁক নেবে দুদিকে। হয়তো এ পরিচয় স্মৃতি হবে সারাজীবনের। এ বিচ্ছেদ পোড়াবে ততদিন। নোমান একটু গম্ভীর হয়ে পড়ে। সুলতানা স্বগোক্তি করল, পথ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশের আরও গল্প শোনা যেত। নোমান চুপ করে রইল। সুলতানা জিজ্ঞেস করল, আপনি আবার কবে ভারতে আসবেন? নোমান ছোট্ট করে বলল, জানি না। সুলতানা বলে, আগামীবার এলে আমাদের আসাম বেড়াতে যাবেন। অনেক সুন্দর। আপনার ভাল লাগবে। আমাদের বাড়িতে আগাম দাওয়াত রইল। নোমান বলল, দাওয়াত দিলেন কিন্তু ঠিকানা তো দিলেন না। আপনি কি ফেসবুক ইউজ করেন? সুলতানা বলল, বাসায় তো ইন্টারনেট নেই। আমি কোন ক্যাফে’তেও বসি না। যারা ফেসবুক ইউজ করে তারা পরস্পরকে যেচে এড্রেস দেয়। সুলতানার সঙ্গে এতক্ষণের আলাপের পর নিশ্চয় মিথ্যা বলার কথা নয়। নোমান ভাবছিল, সুলতানার কাছে কি মেইলিং এড্রেস ও ফোন নাম্বার চাইবে। সুলতানাও যেচে দিচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর সুলতানা বলল, সিনাকী হৈ ভাল্ লাগিল্। আপনার কথা সারাজীবন মনে থাকবে। নোমান বিস্ময়ের সুরে বলল, মাত্র কয়েকঘণ্টার স্মৃতি। সুলতানা বলল, কিন্তু আপনার গল্পের ভেতর দিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি আমার পূর্বপুরুষের দেশ। ময়মনসিংহ থেকে কক্সবাজার, সুন্দরবন। আচ্ছা সুন্দরবনে কি সরাসরি বাঘ দেখা যায়? নোমান দুষ্টুমি করে বলল, আপনি কিন্তু একটি জলজ্যান্ত বাঘের সামনে বসে আছেন। সুলতানা চোখ পাকিয়ে বলল, মানে! নোমান হেসে বলল, আমাদের জাতীয় পশু হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। সৌর্য-বীর্যের প্রতীক। তাই আমরা নিজেদের টাইগার হিসেবে পরিচয় দিই। নোমানের কথা শুনে সুলতানা হেসে বলল, আপনি তো তাহলে ভদ্রবাঘ। হালুম করে ঝাঁপিয়ে পড়েননি। নোমান ও সুলতানার হাসির শব্দের মধ্যেই বেজে উঠল ডিব্রুগড় এক্সপ্রেসের ভেঁপু।

লেখক : কাফি কামাল, সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*