Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | পানিবন্দী কক্সবাজারের ৭ উপজেলার মানুষ

পানিবন্দী কক্সবাজারের ৭ উপজেলার মানুষ

Bazar-Ghata-Pic-220150625160532

মঙ্গলবার রাত থেকে কক্সবাজার জেলায় মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। টানা বর্ষণ আর অমানিশার জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে জেলার নিম্নাঞ্চল। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। প্লাবিত হচ্ছে রাস্তাঘাট, দোকানপাট।

টেকনাফ, কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, চকরিয়া , পেকুয়া ও রামু উপজেলার বেশ কিছু এলাকার লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। পাহাড়ের পাদদেশে সৃষ্ট জেলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া তিন নদীর তীরবর্তী এলাকার মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভাঙনের আশঙ্কায় নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, গত কয়েকদিন ধরে সাগরে নিম্নচাপ বিরাজ করছে। কক্সবাজারসহ সমুদ্র বন্দরগুলোকে ৩ নম্বর সতর্ক সঙ্কেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। এর প্রভাবে কক্সবাজার জেলায় থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছিল রোববার থেকে। কিন্তু মঙ্গলবার রাত থেকে মুষলধারে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। বুধবার ভোর ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ৪৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অফিস। এছাড়া অমানিশার জোয়ারের ফলে বেড়ে গেছে সমুদ্রের পানির উচ্চতাও। এখনো অব্যাহত রয়েছে বর্ষণ।

অনবরত বর্ষণের পানি জমে কক্সবাজার শহরের হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, লারপাড়া, চাদেরপাড়া, হাজিপাড়া, পেশকারপাড়া, এসএমপাড়া, বিডিআর ক্যাম্প, পেতাসওদাগরপাড়া, রুমালিয়ারছরা, চরপাড়া, সমিতিপাড়াসহ শহরের আশপাশের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে।

পাহাড়ি মাটির কারণে ড্রেন ভরাট হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি হলেই শহরের বাজারঘাটা এলাকা অধিকাংশ সময় কোমর ও হাঁটু সমান পানিতে ডুবে যাচ্ছে। বুধবার দিন ও রাতে এবং বৃহস্পতিবার সকাল থেকে কয়েকবার বৌদ্ধমন্দির সড়ক, গোলদিঘীর পাড়, অ্যাডভোকেট সালামত উল্লাহ সড়ক উপচে পড়া পানি প্রবাহিত হয়ে বন্ধ রয়েছে রিকশা, সিএনজি, মাহিন্দ্র ও টমটমসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল। এতে পথচারীদের যাতায়াতে অসুবিধা পোহাতে হচ্ছে। বাজার এলাকার অধিকাংশ দোকানপাটে পানি প্রবেশ করে মালামাল ভিজে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় ২ জন রিকশাচালক বৌদ্ধমন্দির এলাকায় পানির স্রোতে পড়ে ভেসে গিয়ে আহত হয়েছেন। স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

শহর ছাড়াও সদরের ঈদগাঁওর বাজার এলাকা, কালিরছরা, ভোমরিয়াঘোনা, পাঁহাশিয়াখালী, সিকদারপাড়া, জালালাবাদ ইউনিয়নের ফরাজীপাড়াসহ বিভন্ন এলাকা, ইসলামপুরের নিম্নাঞ্চল, চৌফলদণ্ডীর সমতল এলাকার অধিকাংশ এলাকা জলমগ্ন রয়েছে।

পাহাড়ি ঢলে ঈদগাঁও ফুলেশ্বরী নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইসলামাবাদ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক।

মুষলধারে বৃষ্টিপাতে এখানকার জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। জালালাবাদ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসসহ সরকারি-বেসরকারি নানা স্থাপনা পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। তার পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে রাস্তা-ঘাটের বেহাল অবস্থা। জলমগ্ন পথ পার হয়ে দূর-দূরান্ত থেকে দরিদ্র রোগীরা এসে ডাক্তার দেখাতে পারছেন না।

বাজারের ব্যবসায়ী পীযূষ দেব সাগর জাগো নিউজকে জানান, নদীর বাঁধ পর্যাপ্ত না হওয়ায় নদীতে ঢল নামলেই পানি ঢোকে বাজার এলাকায়। ঢলের পানির স্থায়িত্ব দীর্ঘ হলে ৪ হাজারেরও অধিক দোকানপাট খুলে বসার জোঁ থাকে না। রাস্তার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় সড়ক দিয়ে রোগী চলাচল দূরের কথা সুস্থ মানুষ হাঁটাও দূরহ হয়ে পড়েছে।

রামুর সমাজকর্মী সোয়েব সাঈদ ও নীতিশ বড়ুয়া জাগো নিউজকে জানান, প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রামু উপজেলার বুকচিরে প্রবাহিত বাঁকখালী নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ কারণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের শত শত বসত ঘর প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের বুথপাড়া, অফিসেরচর, কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের মনিরঝিল, রাজারকুলসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁকখালী নদীর বেড়িবাঁধ ঝুকিপূর্ণ হওয়ায় লোকজন আতঙ্কিত হয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যাচ্ছেন।

অতি বর্ষণের ফলে রামু উপজেলার বিভিন্ন স্থানে কাঁচাঘর বিধ্বস্ত, পাহাড় ধস, গ্রামীণ সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কসহ কয়েকটি সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। রামু তেমুহনী-জাদিমুরা সড়কের বুথপাড়া সংলগ্ন এলাকায় বিগত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোনো মূহুর্তে সড়কসহ বাঁধটি ধসে বসত ঘর ও ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ওই এলাকার বাসিন্দারা। আতঙ্কিত লোকজনকে বুধবার রাত পর্যন্ত পরিবারের সদস্য, গবাদিপশুসহ মালামাল সরিয়ে নিতে দেখা গেছে।

এছাড়া একই সড়কে নবনির্মিত ক্যজওয়ে হয়ে বুধবার সন্ধ্যা থেকে বাঁকখালী নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে হাইটুপী, উত্তর মেরংলোয়া,পশ্চিম মেরংলোয়া, হাসপাতালপাড়াসহ আরো কয়েকটি গ্রামের ফসলি জমি ও বসত ঘর প্লাবিত হতে শুরু করেছে।

এছাড়া প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল, দক্ষিণ মিঠাছড়ি, চাকমারকুল ও পাহাড়বেষ্টিত ঈদগড় ইউনিয়নে ব্যাপক এলাকা প্লাবিত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

রামুর অফিসেরচর আতিকক্কাবিবির ঘাট এলাকায় নবনির্মিত সেতুর পাশে বেড়িবাঁধ নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এ কারণে স্থানীয় লোকজন ফের বেড়িবাঁধ ভাঙন আতঙ্কে রয়েছেন।

জানা গেছে, বর্ষণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কারণেও হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। এতে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। উপজেলার সদর ফতেখারকুল ইউনিয়নের শ্রীকুল,হাইটুপি, শ্রীধনপাড়া,পশ্চিম মেরংলোয়া, বড়ুয়া পাড়া, মধ্যম মেরংলোয়া, পূর্ব মেরংলোয়া, মন্ডলপাড়া, হাজারীকুল, রাজারকুল ইউনিয়নের পূর্ব রাজারকুল, হাজ্বীপাড়া, দক্ষিন রাজারকুল, সিকদার পাড়ায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এসব গ্রামের লোকজন চলাচলেও চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

জোয়ারিয়ানালা সিকদারপাড়ার শামশুল আলম জানান, কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে সোনাইছড়ি খালের বিভিন্ন অংশে ভাঙন তীব্র হয়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে আশপাশের অর্ধ শতাধিক বাড়ির বাসিন্দা।

কাউয়ারখোপ ইউনিয়ন নিকাহ রেজিস্ট্রার কাজি আবদুল্লাহ আল মামুন জাগো নিউজকে জানিয়েছেন, প্রবল বর্ষণে বাঁকখালী নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় এ ইউনিয়নের মনিরঝিল, ফরেস্ট অফিস, গাছুয়াপাড়ায়সহ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

এদিকে অতি বর্ষণের ফলে পাহাড়ি ঢলে রামু-নাইক্ষ্যংছড়ি সড়কের জারুলিয়ারছড়িসহ কয়েকটি প্লট পানিতে প্লাবিত হওয়ায় সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।

রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ হোসেন বুধবার রাত ৮টার পর রামু তেমুহনী-জাদিমুরা সড়কের বুথপাড়া সংলগ্ন এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ দেখতে যান। এসময় তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

এদিকে, অমানিশার জোয়ারে ফুঁসে উঠেছে বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী। দেশের সর্ব দক্ষিণ সীমান্ত উপজেলা টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ সমুদ্রের করাল গ্রাসে দেশের মূল ভূখন্ড থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ লড়াই করে বসবাস করছেন। প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড়, হ্যারিকেন, সিডর, আইলা, রেশমী, বিজলী ও নার্গিসের আঘাতে বেড়িবাঁধ, ঘরবাড়ি, সড়ক ও জনপথ লণ্ডভণ্ড হয়ে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এ অঞ্চলের মানুষ এখন হারাচ্ছেন বসতভিটা ও জমিজমা। নিঃস্ব হচ্ছেন শতশত পরিবার।

অমানিশার প্রভাবে সৃষ্ট অধিক উচ্চতার জোয়ারের পানি খোলা বাঁধ দিয়ে ঢুকে টেকনাফে অন্তত ১৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে করে কয়েক হাজার মানুষ পরিবার পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ভুক্তভোগী এলাকাবাসী বেড়িবাঁধ সংস্কার ও রক্ষার দাবিতে স্থানীয় সংসদ ও বিভিন্ন সরকারি অধিদফতরে একাধিকবার দাবি জানান।

উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও রাজাপালং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী জানিয়েছেন, উখিয়ায় গত কয়েক দিনের অবিরাম বর্ষণে নিম্নাঞ্চলসমূহ প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার একর কৃষি জমি জলমগ্ন হয়ে পড়ার কারণে আমন চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে সময়মতো আমন চাষাবাদ শুরু করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলেছেন কৃষকরা।

উখিয়া উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা জায়, চলতি মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার একর জমিতে আমন চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গেল বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চাইতে বোরো উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও ধান, চালের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষকরা চাষাবাদে নিরুৎসাহী হয়ে পড়েছেন বলে অনেকেই মনে করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*