ব্রেকিং নিউজ
Home | উন্মুক্ত পাতা | পরিবেশ ও মানবাধিকার বান্ধব বিশ্ব চাই

পরিবেশ ও মানবাধিকার বান্ধব বিশ্ব চাই

281

অধ্যক্ষ এম. সোলাইমান কাসেমী : সৃষ্টির ঊষালগ্নে মানুষ বাস করতো অরণ্য প্রকৃতির নিবিড় ছায়ায়। এ অরণ্য প্রকৃতির নিঃশব্দ ধ্বনিতে ধরিত্রীর প্রথম স্বপ্নভঙ্গ। তার অযুত নিযুত সাধনায় শ্যামলে সিংহাসন প্রতিষ্ঠা। প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় পল্লব অক্ষরে তারই বিজয় আখ্যানলিপি। তখন প্রকৃতিতে বিরাজ করতো পূর্ণ ভারসাম্য। প্রকৃতি মায়ের অফুরন্ত স্নেহের দানে পুষ্ট হয়ে তখনকার মানুষ এগিয়ে যায় সভ্যতার দিকে। তারপর একদিন সভ্যতা এলো তার বিজয় রথে আসীন হয়ে, অরণ্যচারী যুদ্ধবদ্ধ মানুষ গড়ে তুললো নগর সভ্যতা। সভ্যতা যতই প্রসারিত হয়েছে মানুষ যতই প্রকৃতির জগৎ থেকে নির্বাসিত হয়েছে। জীবনে এসছে যন্ত্রের অধিকার। মানুষ নিজ হাতে নির্মূল করেছে তার শৈশব সভ্যতার সঙ্গী তরুরাজীকে। বিজ্ঞানের নব নব আবিস্কারে মানুষ যেদিন মেতে উঠলো সেদিন থেকেই শুরু হল তার নাগরিক জীবন পরিবেশ গঠনের অমিত উৎসাহ। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষপর্ব থেকেই বিজ্ঞানের জয়যাত্রার শুভারম্ভ। দিকে দিকে চললো শিল্পোন্নয়ন। প্রযুক্তিবিদ্যার সাফল্য মানুষকে করল দিশেহারা। নগরকেন্দ্রিক মানবতার ঘটলো প্রসার। নিদারুন উদাসীন্যে পরিত্যক্ত হল বনভূমি। শুধু তাই নয়, জনসংখ্যা বৃদ্ধির অজুহাতে সে বনের পর বন উজার করলো। নতুন নতুন জনপদ হলো সৃষ্টি। হলো কারখানার সম্প্রসারণ, খাদ্যের প্রয়োজনে মানুষ অরণ্য অঞ্চলকে পরিণত করল আবাদি জমিতে। বিলাস দ্রব্যের নেশায় বনজ বৃক্ষের হলো উৎপাদন। মানুষ অজ্ঞাতসারেই বিশ্ব নিয়মের নীতি করল লঙ্ঘন। তার পরিণতি হল ভয়াবহ। সভ্যতা আমাদের যেমন দিয়েছে প্রচুর তেমনি কেড়ে নিয়েছেও অনেক কিছু। আমরা হারিয়ে গেছি তাপদগ্ধ পৃথিবীর শ্যামল ছায়ায়, নষ্ট হয়েছে পৃথিবীর ভারসাম্য। বৃষ্টিধারা গেছে হারিয়ে, রুক্ষ হয়েছে প্রকৃতির স্বভাব। টান পড়েছে পৃথিবীর অক্সিজেনের ভান্ডারে। কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে জনাকীর্ণ নগরীর বাতাস হয়েছে আজ বিষবাষ্প। পৃথিবীর ওজন স্তর গেছে অত্যধিক রকম বেড়ে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা গেছে বেড়ে। কারণ সূর্য থেকে যে তাপ রশ্মি পৃথিবীতে পড়ে তা পৃথিবীর পৃষ্ঠে হয়ে বিকরিত হয়ে ওজন স্তরের জন্য আর ফিরে যেতে পারে না। এমনি অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর বিভিন্ন উপকূলীয় স্থান সমুদ্রগর্ভে ডুবে যাবার সম্ভাবনা রয়েছে। আজ মানুষের খাবারের টেেিবল এসেছে নানা রকমের কৃত্রিম উপচারাদি। কিন্তু একদিন বনজ বৃক্ষের ফল-মূলই ছিল মানুষের আহার। সে আদিযুগে মানুষের যে গড় আয়ু ছিল, এখন তা কমে প্রায় অর্ধেক এসে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া, আজ দেখা দিয়েছে মারাত্মক দুরাযোগ্য ব্যাধি। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলেই নষ্ট হয়েছে এ প্রাকৃতিক ভারসাম্য। তাই আমাদের প্রত্যেকেরই কর্তব্য প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষরোপণ করা। মানুষ আজ ক্রমশ সচেতন হয়ে উঠেছে। দেশে দেশে আজ শুধু অরণ্য সংরক্ষণ নয়, অরণ্য সম্প্রসারণেরও কাজ চলছে। বৃক্ষরোপণ উৎসব শুধু প্রকৃতিকে ভালবাসার স্মারক নয়, এ হলো মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার এক মহা প্রয়াস। দারিদ্র্য, জনসংখ্যা বিষ্ফোরেণ ও শিল্প বিস্তারের ত্রিমুখী আক্রমণে বাংলাদেশের বনাঞ্চল আজ ক্রম বিলীয়মান। নির্বিচারে অরণ্য উচ্ছেদের কারণে প্রকৃতির স্বাভাবিক সুষম্য আজ বিনষ্ট। দেখা দিয়েছে ভূমিক্ষয়, উষরতা, বৃষ্টিহীনতা। সর্বনাশ সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই আজ সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। আসুন সকলে মিলে আজ থেকে আমরা বৃক্ষরোপণে ব্রতী হই এবং আমাদের আজকের শ্লোগান হউক একটি গাছ একটি প্রাণ। দেশে ব্যাপকভাবে বন সৃষ্টির জন্য যেটা প্রয়োজন তা হলো বৃক্ষ নিধন নয় বরং বৃক্ষরোপণ। বিলম্বে হলেও সরকার এ রূঢ় সত্য অনুধাবন করতে পেরেছেন। দেশকে প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য দেশে ব্যাপকভাবে বনায়ন করা দরকার। তাই সরকার উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন নার্সারী গড়ে তুলেছেন। বিনামূল্যে বা অল্প মূল্যে লক্ষ লক্ষ চারা জনগণের মাঝে বিতরণ করেছেন এবং প্রত্যেককে অন্তত একটি গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। সরকার জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ১৯৯৪ সালের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহকে বৃক্ষরোপণ সপ্তাহ হিসাবে ঘোষণা করেছেন। জনগণ অবশ্য ব্যাপকভাবে সাড়া দিয়েছেন। তাঁরা কম বেশি গাছ লাগাচ্ছেন। তবে দেশকে ব্যাপকভাবে বনায়ন করার জন্য কেবল সরকারী উদ্যোগই যথেষ্ট নয় বরং সরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারী সংগঠন এমনকি প্রত্যেকটি সচেতন নাগরিককে এগেিয় আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন অনেক পরিবেশবিদগণ। তাই আমরা পরিবেশ ও মানবাধিকার বান্ধব বিশ্ব চাই। তবেই আবার দেশ সবুজে শ্যামলে ভরে উঠবে। রহিত হবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বৃক্ষরোপণ অভিযান সম্পর্কে উপসংহারে কেবল এতটুকু বলা যায়, এটা একটা মহতী অভিযান। এ অভিযান যেন খাতা-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবে কার্যকরী হয় সেদিকে সরকার এবং আমাদের প্রত্যেকেরই সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। আগামী প্রজন্মে সুখে শান্তিতে বসবাসের অঙ্গীকার থেকে আর নয় বৃক্ষ নিধন, বৃক্ষরোপণ করে ফুলে ফলে সবুজ শ্যামলে ভরে তুলি এ বিশ্বকে।

লেখক : মাওলানা এম.সোলাইমান কাসেমী শিক্ষাবিদ ও এমফিল গবেষক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*