ব্রেকিং নিউজ
Home | উন্মুক্ত পাতা | পদুয়ায় গুপ্ত এস্টেট জমিদার বাড়ি ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে

পদুয়ায় গুপ্ত এস্টেট জমিদার বাড়ি ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে

MURAD-0-2-800x508

ইফতেখারুল ইসলাম : দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার পদুয়া তেওয়ারিহাট সংলগ্ন গুপ্ত এস্টেট তথা জমিদারের বংশধররা এখন খ্যাতির বিড়ম্বনায় ভুগছেন। অপূর্ব কারুকাজে নির্মিত বিশাল এই বাড়ির অবস্থা শোচনীয়। জরাজীর্ণ এ রাজবাড়িতে ১৩ পরিবার বাস করলেও তাদের মধ্যে নেই কোনো প্রাণচাঞ্চল্য। দারিদ্র্য যেন কেড়ে নিয়েছে তাদের সব সুখ। অথচ এ রাজবাড়ির সামনে দিয়ে একসময় কেউ জুতা পায়ে কিংবা ছাতা মাথায় দিয়ে পর্যন্ত হেঁটে যেতেন না। সাড়ে তিন শতাধিক বছরের পুরনো লোহাগাড়ার পদুয়ার জমিদার বাড়ি এখন ক্ষয়ে ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। গুটাতে গুটাতে গুপ্ত এস্টেট এখন অস্থিত্ব সংকটে পড়েছে। লোহাগাড়া উপজেলার এই জমিদার বাড়ির নাম গুপ্ত এস্টেট হলেও এলাকাবাসী জানেন হদ্দার বাড়ি হিসেবে। স্কুল এবং সাইনবোর্ডে লেখা আছে ওয়ার্ড বাড়ি। জমিদারের বংশধর সুহৃদ গুপ্ত জানান, তাদের বাড়ির নাম একাধিক হলেও ‘গুপ্ত এস্টেট’ এবং ‘ওয়ার্ড বাড়ি’ নামটাই সঠিক। সরেজমিনে দেখা যায়, বিশাল সেই বাড়ি দুইভাগে বিভক্ত। বাড়ির প্রবেশমুখে কারুকার্যসম্বলিত দীর্ঘ গেট। এক ভাগে বিশাল কাচারি ঘর, যেখানে বসে রামমোহন তার বিচারকার্য চালাতেন। ।

অপর ভাগের পুরোটাই অন্দরমহল। রাজবাড়ির ভেতরেই রয়েছে বিশাল মন্দির, পাঠশালাসহ সব সুযোগ–সুবিধা। ভবনের দেয়ালগুলি বিশালাকারের। ভবনের সামনে বড় বারান্দা। চুন–সুরকি এবং ইট দিয়ে তৈরি বিশালাকারের দেয়ালগুলি পিলার হিসেবে দ্বিতল ভবনকে এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তিন পাশে বাড়ি এবং একপাশে মন্দির। মাঝে খালি মাঠ এবং নাচখানা ছিল। ভবনের দেয়ালগুলি কারুকাজম–িত। তবে বর্তমান বাসিন্দারা কিছু কিছু অংশে নতুন করে পলেস্তরা দিয়ে নিজেদের বসবাসের উপযোগী করেছেন। তারা তাদের সামর্থ অনুযায়ী সংস্কার করার চেষ্টা করলেও আগাছা এবং শেওলার সাথে পেরে উঠছেন না। দেয়াল পরিষ্কার করার কিছুদিনের মধ্যেই ফের শেওলা এবং আগাছা জন্মে যায়। বাড়ির মাঝখানে যে মাঠ রয়েছে তাতে এখনো বাড়ির শিশুরা খেলাধুলা করে। প্রতিবছর দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম আকর্ষণীয় শারদীয় দুর্গোৎসব এই মাঠেই।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আজ থেকে তিন শতাধিক বছর আগে ময়মনসিংহ জেলার কোনো এক গ্রাম থেকে ভোলানাথ গুপ্ত নামের একলোক কাজের সন্ধানে লোহাগাড়ার (তৎকালীন সাতকানিয়া) পদুয়া গ্রামে এসে পরিবার–পরিজন নিয়ে বসবাস শুরু করেন। আরাকান রাজা শাসিত এ অঞ্চলে এসে ভোলানাথ জীবিকার তাগিদে নেমে পড়েন কাজে। তখন চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ছিল আরাকান রাজ্য। পাহাড়ি এলাকা হওয়ার কারণে এলাকার বেশিরভাগ বসতি ছিল উপজাতীয় গোষ্ঠী যেমন মগ, চাকমা, মুরং সম্প্রদায়ের। তাই এখনও চট্টগ্রাম–কক্সবাজার সড়কটি আরাকান সড়ক নামে পরিচিত। এলাকায় তখন মগ–চাকমাদের আধিপত্য থাকার কারণে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ভোলানাথকে অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে রীতিমতো সংগ্রাম করতে হয়। এরপরও হাল ছাড়েননি ভোলানাথ। এরই মধ্যে ভোলানাথের সংসারে জন্ম নেয় রামমোহন গুপ্ত, রামচরণ গুপ্ত ও রামস্মরণ গুপ্ত নামে তিন শিশুপুত্র। ভোলানাথের গল্পের দ্বিতীয় পর্বটা খুবই সুখের। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারে অনাবিল সুখ নিয়ে আসেন তিনি। ভোলানাথ মারা যাওয়ার পর সংসারের হাল ধরেন রামমোহন গুপ্ত। রামমোহনের মোহনীয় চরিত্র এলাকার হিন্দু–মুসলিম সবার কাছেই সমান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় তিনি স্থানীয় হিন্দু–মুসলিম তথা বাঙালি সমাজকে একত্রিত করে আদিবাসী খেদাও আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে বাঙালিদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মুখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয় আদিবাসীরা। তখন বাঙালিদের পরাক্রমশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন রামমোহন গুপ্ত। অসাম্প্রদায়িক চেতনার পরোপকারী মানুষ হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি ছিল রামমোহনের। জনশ্রুতি আছে, পরোপকারের সূত্র ধরে রামমোহনের সঙ্গে ধর্মবোনের সম্পর্ক গড়ে ওঠে পদুয়া গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা নিঃসন্তান মুসলিম মহিলা বিলকিস খাতুনের। একসময় বিলকিস খাতুন স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে বিপুল গুপ্তধনের সন্ধান পান। কিন্তু নিঃসন্তান বিলকিসের পক্ষে সেই গুপ্তধন উদ্ধার করা সম্ভব না হওয়ায় তিনি ধর্মভাই রামমোহনের সহায়তায় এ বিপুল পরিমাণ গুপ্তধন উদ্ধার করেন। পরে বিলকিস সব গুপ্তধন দান করে দেন ধর্মভাই রামমোহনকে। ধর্মবোনের কাছ থেকে পাওয়া বিপুল সম্পদ দিয়ে রামমোহন গড়ে তোলেন বিশাল সা¤্রাজ্য। এখান থেকেই শুরু পদুয়ার জমিদার বাড়ি গুপ্ত এস্টেটের ইতিহাস। গুপ্তধনের বদৌলতে হঠাৎ জমিদার বনে যাওয়া রামমোহন তার ধর্মবোন বিলকিসকে সঙ্গে নিয়ে পদুয়ায় ১০ একর জমির ওপর নির্মাণ করেন অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর এক প্রাসাদসম অট্টালিকা। ১২০ কক্ষের এ বাড়িটি এলাকাজুড়ে তখন পরিচিতি পায় ‘রাজবাড়ি’ হিসেবে। রাজবাড়ির বাসিন্দাদের ব্যবহারের জন্য বাড়ির চারদিকে খনন করা হয় বিশালাকার ছয়টি পুকুর। বর্তমানে মাত্র ২০ কক্ষ অবশিষ্ট আছে।
জমিদারের বংশধর পংকজ গুপ্ত জানান, তারা সম্ভবত জমিদারের ১৪তম বংশধর। তাই ভবনটির বয়স চারশ’ বছরের কম নয়। এই বাড়িতে বিম হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। সেসব কাঠ আনার জন্য একটি খাল খনন করা হয়েছিল। যার নাম কৃষ্ণ খাল। যিনি খালটি খনন করেছিলেন তার নামেই খালটির নামকরণ করা হয়েছিল। বিশাল বাড়ির পশ্চিম পাশের ভবনটি ভেঙ্গে এক তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। দক্ষিণ পাশের দ্বিতল ভবনটি এখনো কোনভাবে টিকে আছে। পূর্বপাশের ভবনটির উত্তরাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। দক্ষিণাংশ কোনভাবে টিকে আছে। মূল ভবনের পূর্ব পাশে আরেকটি দ্বিতল ভবন আছে। বর্তমানে সেটির ধ্বংসাবশেষ টিকে আছে।

পদুয়ার এই জমিদারের ছিল প্রচুর ভূ–সম্পত্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবানের টংকাবতীর দক্ষিণ হাঙ্গরে ৮ নং ফ্রি চিম্পল লর্ড (২৭০৬ একর) রাণী ভিক্টোরিয়া সম্পূর্ণ পদুয়ার জমিদারদের উপহার দেন। তবে জমিদার কেবল নিজের সুখে বিভোর না থেকে জনগণের সুবিধার্থে রামমোহন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন একাধিক মসজিদ, মন্দির, স্কুল, বাজার, দিঘি ও ডাকঘরসহ অসংখ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। পদুয়া তেওয়ারি হাট, পদুয়া হাইস্কুল, ওয়ার্ড বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পদুয়া দিঘি, কৃষ্ণ খাল (খননকৃত) এরই উদাহরণ। শুধু নিজ এলাকা পদুয়ায় নয়, আরও অনেক এলাকায় তিনি গড়ে তোলেন সেবা প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন প্রান্তে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তিও ক্রয় করেন তিনি। যার অস্থিত্ব এখনও খুঁজে পাওয়া যায় বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মিয়ানমার ও কলকাতায়। এসব ভূ–সম্পত্তির খাজনা আদায়ে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হয় ২২টি তহশীল অফিস। প্রজাদের বেচা–কেনার সুবিধার্থে প্রতিষ্ঠা করেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় বাজার পদুয়া তেওয়ারীহাট। জমিদার কৃষ্ণ গুপ্ত এলাকার মানুষের সেচ সুবিধার জন্য তৈরি করেন বিশাল খাল যা এলাকায় কৃষ্ণ খাল নামে পরিচিত। এছাড়া জমিদারদের খনন করা বিশাল ঠাকুরদিঘিটির নামে পুরো এলাকার নামাকরণ হয়ে গেছে ঠাকুরদিঘি।

কথিত আছে, রাজবাড়ির সামনে দিয়ে কেউ কখনো জুতা পায়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতেন না। স্বয়ং বৃটিশরাও এ জমিদার বাড়িকে সম্মান জানাতো। দাপট নিয়েই জমিদারি চালাতে থাকেন জমিদার রামমোহন। কিন্তু ধর্মবোন বিলকিস মারা গেলে মুষড়ে পড়েন তিনি। রামমোহন তার ধর্মবোনের নামে প্রতি বছর একই রঙের আটটি গরু জবাই করে বিশাল মেজবান ও মিলাদের আয়োজন করতেন। প্রায় অর্ধশতাব্দি ধরে জনগণের আস্থা নিয়ে দাপটের সঙ্গে জমিদারি চালানোর পর মারা যান জমিদার রামমোহন। তিনি মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একে একে হারিয়ে যেতে থাকে সবকিছু। তার উত্তরসূরিরা বন্ধ করে দেয় বিলকিসের সম্মানে আয়োজিত মেজবান ও মিলাদ। বিলকিস খাতুনের সম্পদ দিয়ে বিশাল এ সা¤্রাজ্য গড়ে তোলার কথাও তারা ভুলে যায়। ১৯৪৮ সালে পাক–ভারত উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হলে অবসান ঘটে পদুয়া জমিদারির।

জমিদার বাড়ি গুপ্ত এস্টেটের পরের ইতিহাস খুবই করুণ। জমিদারি হারানোর পর রামমোহনের উত্তরসূরিরা গা ভাসিয়ে দেন ভোগ ও বিলাসিতায় দিকে। বিলাসিতাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে তারা কর্মহীন জীবন শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা বিক্রি করতে শুরু করেন জমি। ধীরে ধীরে ছোট হতে থাকে গুপ্ত এস্টেট। বর্তমানে রামমোহনের জমিদার বাড়ির অস্থিত্ব কেবল কালের সাক্ষী হয়েই দাঁড়িয়ে আছে। পুরো রাজবাড়ি ঘুরে কারুকাজখচিত বিশাল বাড়িটির করুণ দশা চোখে পড়ার মতো। এর চেয়েও বেশি করুণ দশা বিশাল এ ভবনে বাস করা বাসিন্দাদের। এক সময়ের প্রতাপশালী জমিদার রামমোহনের উত্তরসূরিদের এখন দিন কাটছে প্রচ– অভাব–অনটনে। পুরো ভবনটিরই এখন জরাজীর্ণ অবস্থা। যে কোনো সময় ভেঙে পড়ে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে এ ভবনে বসবাস করছেন কিছু বংশধর। বাকিরা চট্টগ্রাম শহরে। একটি অংশ ভারতে চলে গেছে।

বাড়ির প্রবীণ সদস্য, রেলওয়ের সাবেক কর্মকর্তা পংকজ গুপ্ত পূর্বকোণকে জানান, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেসময় মূল্যবান জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বাড়ির দরজা–জানালাও লুট করে নিয়ে যায় দুর্বত্তরা। এরপর থেকে তারা চারদিক থেকে শুধু গুটিয়ে যাচ্ছেন। জমিদার পরিবারের বিপুল জমি নানা কৌশলে দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। এমনকি ভিটের জমি পর্যন্ত বেদখল হয়ে যাচ্ছে। এই বাড়িতে এখন আনন্দ নেই। শুধুমাত্র দুর্গাপূজা এলে বাড়িটি আনন্দে ভরে উঠে। তার কথা সত্যতা মিলে এবাড়ির গৃহিনীদের সরকারি সাহায্যের আকুতি শুনে। তারা বলেন, জমিদার নামটা এখন তাদের জন্য খ্যাতির বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে। সরকারি–বেসরকারি কোন সংস্থা তাদের সাহায্য করে না। তারা চান তাদের এই বাড়িটি সংস্কার করতে। কিন্তু সামর্থ না থাকায় পারছেন না। সংস্কার কাজে তারা সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই বাড়ি দেখার জন্য দূর–দুরান্ত থেকে অনেক পর্যটক ছুটে আসেন। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে বিস্তর। তবুও সরকারের দৃষ্টিতে পড়েনি। চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে তেওয়ারিহাট সংলগ্ন এই বাড়িটির যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত ভাল। সরকারের যেকোন কর্তাব্যক্তি ইচ্ছে করলেই ঢু মারতে পারেন। কিন্তু এটি রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসছেন না। তাদের মতে, রাজবাড়ির যে অংশটুকু এখনও ইতিহাসের অস্থিত্ব ধারণ করে আছে তা প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হলে রক্ষা হবে গুপ্ত এস্টেটের অনেক স্মৃতি। না হলে কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে রাজবাড়ি হিসেবে পাক–ভারত উপমহাদেশে খ্যাতি পাওয়া গুপ্ত এস্টেটের ইতিহাস।

-দৈনিক পূর্বকোণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*