ব্রেকিং নিউজ
Home | শীর্ষ সংবাদ | নোকিয়া ১১০০

নোকিয়া ১১০০

file27

নাজমুল হক তপন : ‘এই পাজি, তুই যদি নটরডেম কলেজে চান্স পাস, তাহলে তোকে একটা সেট কিনে দেব। নোকিয়া ১১০০। এসএসসি এক্সাম আর দু মাসও বাকি নাই। এবার একটু সিরিয়াস হ।’ প্রতীক ওরফে পাজিকে পড়াতে পড়াত এক নিশ্বাসে কথাগুলো বললেন মহল্লার সবার প্রিয় ছবি আপা।

প্রতীকের তিন বছরের সিনিয়র। সবে ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্লাশ ফাইভ-এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পাওয়া। এএসসি, এইচএসসিতেও দারুণ রেজাল্ট। তবে ঢাবিতে পছন্দের ইকোনোমিক্স পাননি। ভর্তি হয়েছেন সোসিওলোজিতে। জুনিয়ররা তো বটেই মহল্লার সমবয়সীরাও বছরের পর বছর ধরে ছবি আপার ছাত্র। ছবি আপার প্রিয ছাত্রদের অন্যতম পাজি। প্রচণ্ড ইনসিনসেয়ার। তবে ম্যাথসে ক্লাস তথা স্কুলে সেরা। রাত-দিন টিভিতে স্পোর্টস দেখা, সাহিত্য পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া আর টই টই ঘুরে বেড়ানো- পাঠ্য বইয়ের মধ্যে নিজেকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দেয়ার সময় কোথায় পাজির?

পরীক্ষার আগের রাতেও পড়ার চেয়ে ব্রায়ান লারার ব্যাটিং তাকে বেশি টানে। এসব দেখে প্রতীকের মা ছেলেকে ডাকেন ‘পাজি’ বলে; কিন্তু এই ‘পাজি’ নামটা সীমাবদ্ধ থাকেনি শুধু মা-ছেলের মধ্যে। ছবি আপা ‘পাজি’ নামটা স্ট্যাবলিশ করে ছাড়েন পুরো মহল্লায়। ছবি আপার মত ট্যালেন্টপুলে না হলেও ফাইভ-এইট দুটোতেই জেনারেল গ্রেডে স্কলারশিপ পেয়েছে পাজি।

ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হয়ে যাবে। তাই এসএসসি পরীক্ষার আগে শেষবারের মত পাজিকে পড়াশুনা দেখিয়ে দিচ্ছেন ছবি আপা। শেষ পর্যন্ত নটরডেম কলেজে সায়েন্সে ভর্তি হতে পারল পাজি। নটরডেম কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বসুন্ধরা শপিং কমপ্লেক্স থেকে ৪৬৭৫ টাকা দিয়ে পাজিকে নোকিয়া-১১০০ মডেলের সেলফোন কিনে দিলেন ছবি আপা। আর কান মলে দিয়ে বললেন ‘এই সেট দেয়ার একটা উদ্দেশ্য আছে। দেখি কেমন তোর বুদ্ধি?’

পাজির ঝটপট জবাব ‘সবার খোঁজ–খবর রাখা।’ ছবি আপার হাসতে হাসতে উত্তর ‘দুর গাধা। তোর কাছে কি খোঁজ নেব। তুই মহল্লার কোন খোঁজটা রাখিস? মহল্লার খোঁজ দেয়ার অনেক দায়িত্ববান মানুষ আছে।’ এবারে নাক টিপে দিয়ে বললেন, ‘আমার যখন যে কবিতাটা শুনতে ইচ্ছা করবে, আমি ফোন দেয়া মাত্রই সেটা শুনিয়ে দিবি। যতদূর জানি, আমারই প্রিয় প্রায় সব কবিতাই তোর মুখস্ত। লারা-শচীন ব্যাট করলেও আমাকে কবিতা শুনাবি, যেটা শুনতে চাইব। কোন ওজর-আপত্তি চলবে না।’

এইচএসসিতে পাজির বেশ ভাল রেজাল্ট। অনেকেই এতটা আশা করেনি; কিন্তু পাজির সাফ জবাব, কলা ভবনে পড়বে। তার যুক্তি ‘বায়োলোজি পারি না। মেডিকেলে চান্স পাব না। ইঞ্জিনিয়ারিংযে পড়ার চাপ বেশি, ফেল করব। ভাল সায়েন্সের সাবজেক্টে লাঞ্চের পর প্র্যাকটিক্যাল আমার দ্বারা হবে না।’ শেষ পর্যন্ত পাজি ভর্তি হলো ইকোনোমিক্সে। ছবি আপার সঙ্গে মাঝে মধ্যে দেখা হয়; কিন্তু টিএসসি, পাবলিক লাইব্রেরিতে চা খাওয়া এর মধ্যেইে আটকে থাকল এই দেখা সাক্ষাত। এক/দুইবার বেইলি রোডে মঞ্চ নাটক দেখা আর দু’একবার ঈদের আগে এক সঙ্গে নিজেদের শহরে ফেরা। তবে নোকিয়া-১১০০ এর ব্যবহার বেড়েছে অনেক। প্রায় প্রতি সপ্তায় কমপক্ষে একবার হলেও ছবি আপাকে কবিতা শুনাতে হয় পাজিকে।

ছবি আপার মাস্টার্স শেষ। হঠাৎ মাঝরাতে ফোন। বললেন, ‘রবি ঠাকুরের, বিদায় অভিশাপ কবিতাটা শুনাতে। বিশাল কবিতাটা সারা রাত ধরে মুখস্ত শুনালো পাজি।’ শেষ দিকে আবেগে গলা ধরে আসে পাজির, ‘আমি বর দিনু দেবী, তুমি সুখী হবে/ভুলে যাবে সর্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।’ বন্ধুরা সবাই অবাক। একটা মেয়েকে সারা রাত ধরে কবিতা মুখস্ত শুনিয়েছে, বেয়াড়া স্বভাবের প্রতীক। এনিয়ে হল মেটদের গবেষণা চলল কিছুদিন।

ছবি আপার মাস্টার্স শেষ। হল ছেড়ে দিলেন। উঠলেন মেয়েদের একটা প্রাইভেট হোস্টেলে। জব নিলেন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। বিসিএস প্রস্ততি নেয়ার জন্য আদা-জল খেয়ে পড়লেন। মাস্টার্স শেষের দু’বছরের মধ্যেই সরকারী কলেজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেলেন। মাস্টার্সের শেষ দিকে মারুফ রায়হান নামের এক ভদ্রলোকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হল ছবি আপার। দারুণ ব্রিলিয়ান্ট। পুরো কলা ভবন এক নামে চেনে। অ্যানথ্রোপোলজির তরুণ শিক্ষক। জার্নালে ভারি ভারি লেখা দেন। দেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোতেও তার লেখা ছাপা হয়।

ছবি আপা নিজেই মারুফ সাহেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন প্রতীকের। ভদ্রলোক হাসতে হাসতে বললেন, ‘তুমি তো পাজি।’ এদিকে পিএইচডি প্রোগ্রামে যাবেন মারুফ সাহেব। চার হাত এক করার জন্য দুই পরিবার সময় নষ্ট করতে রাজি না। হাতে দু’মাসের কম সময়। প্রতীকের মাস্টার্স পরীক্ষার কিছুদিন আগের ঘটনা। ছবি আপা ফোন করলেন মাঝরাতে। মাস্টার্স পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন? বিয়েতে আসতে পারবি কি-না এসবের ধার দিয়েও গেলেন না । রবি ঠাকুরের ’ছবি’ কবিতাটা শুনতে চাইলেন। কল দেয়া পুতুলের মত বেসুরো গলায় কবিতাটি পড়া শুরু করল পাজি।

মাঝামাঝি জায়গায়, ‘তোমাকে পেয়েছি কোন প্রাতে/তারপর হারায়েছি রাতে/তারপর অন্ধকারে অগোচরে তোমারেই লভি/নও ছবি নও ছবি নও তুমি ছবি…।’ ঠিক এই পর্যায়ে ছবি আপা বললেন আর কবিতা শুনবেন না। ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দও ভেসে আসল। ছবি আপাকে কখনও কান্না করতে দেখেছে এমনটা মনে পড়ল না পাজির। বোকার মত কিছুক্ষণ পাঁয়চারি করে ছবি আপাকে কয়েকবার ফোন করল; কিন্তু সেলফোন বন্ধ।

প্রতীকের মাস্টার্স শেষ। ভাইভার আগে বেশ কয়েক দিন ছুটি। ছবির আপার বিয়ের ডেটও এই ছুটির মধ্যেই। পাজি এসব খবর শুনল মায়ের কাছ থেকে। হঠাৎ মারুফ সাহেব কল করলেন প্রতীককে। কাল সকালেই জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে বললেন আইবিএ ক্যান্টিনে। সারা রাত এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারল না প্রতীক। মধ্য রাতে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। উদভ্রান্তের মত সকালে হাজির হল ক্যান্টিনে। আগে থেকেই অপেক্ষায় আছেন ছবি আপা। প্রতীকের এই কাক তাড়ুয়া দশা দেখে দুজনই হেসে উঠলেন।

মারুফ সাহেব বললেন, ‘ছবি তুমি ব্রেকফাস্ট নিয়ে আস।’ মারুফ সাহেব বললেন, ‘তোমার মোবাইল সেটটা দাও তো।’ হুম ‘নোকিয়া -১১০০। আট বছর আগের সেট। এই একটাই সেট তোমার? খুব কম ফাংশন আছে সেটটায়। ছবি তোলা নেট ব্রাউজিং এসব সম্ভবত নাই।’ মারুফ সাহেব মিটি মিটি হাসেন আর বলেন’ ‘দেশ ছাড়ার আগে শেষ মাস্টারিয়ানাটা করে নিই। ছবি ভাল কথা তোমাকে বলা হয়নি। আর দুদিন পর আমার ফ্লাইট। আমি কয়েকটা দিন আগে যাচ্ছি। হাতে এক দম সময় নাই। তোমাদের বিয়েতে থাকতে পারছি না। স্যরি।’

ছবি- পাজি কারও কোন কথা না শুনেই মারুফ বলে চললেন, ‘ছবি-পাজি, আঙ্কেল  আন্টি মানে তোমাদের আব্বা-আম্মার সঙ্গে আমার সব কথা বলা শেষ। আর তিন দিন পরে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করবে তোমরা।’ পাজি কিভাবে এটা সম্ভব হল জানতে চাইলে না? মারুফ সাহেব জানালেন, ‘মাত্র দুদিন আগে ছবি আমাকে বলল’ মি; মারুফ আমাকে ছাড়া আপনার খুব ভালোভাবে চলবে; কিন্তু আমাকে ছাড়া পাজি একা চলতে পারবে না।’

পাজি ছলছল চোখে শুধু বলল, ‘স্যার আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেন।’ সকৌতুকে মারুফ সাহেব বললেন, ‘তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়াটা শুধু ছবিকেই মানায়। ভালবাসার পরীক্ষায় আমরা প্রোস্ট্যাবলিশমেন্টরা কখনই উত্তীরর্ণ  হতে পারব না। তোমরা পেরেছ। যে ছেলেটা একটা মেয়ের পছন্দকে জীবনের সবচেয়ে বড় আরাধ্য বিবেচনা করে তাকে তো স্যালুট জানাতেই্ হয়। তুমি বোধহয় ছবির সামনে সিগারেট খাও না। আশা করছি আজকে এইটাই ছবির সামনে তোমার প্রথম এবং শেষ।  আসো দুজনে সিগারেট খাই….।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*