ব্রেকিং নিউজ
Home | লোহাগাড়ার সংবাদ | নারীর ভাগ্যোন্নয়নে শায়েলা খাঁন ।। লোহাগাড়ায় অনুকরণীয় আলোর পথ

নারীর ভাগ্যোন্নয়নে শায়েলা খাঁন ।। লোহাগাড়ায় অনুকরণীয় আলোর পথ

19-03-2015 copy
মোঃ জামাল উদ্দিন : 
শায়লা খাঁন। একজন গৃহবধু। চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী মদুনাঘাট এলাকার একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর স্ত্রী। মাটি ও মানুষের কাছাকাছি এসে লোহাগাড়ার আমিরাবাদে নারীর ভাগ্যোন্নয়নে নিরলসভাবে কাজে যাচ্ছেন। তারা কর্মযজ্ঞকে তুলনা করা অতীব কঠিন। এলাকাবাসীর প্রিয় শায়লা আপা যেন বিধাতার আর্শীবাদ। তার কর্মপ্রবাহ যেন আলোকময় সরল রেখা। তার ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর গল্পটি অত্যন্ত চমৎকার। এতদূর আসার পিছনে রয়েছে স্বামী মোহাম্মদ উল্লার অবদান, শ্বাশুড়ি ও মায়ের অনুপ্রেরণা। তারাই তাকে এতদূর আসার পিছনে কাজ করেছেন। শায়লা খাঁন তার বাবার প্রতিষ্ঠিত আমিরাবাদ জনকল্যাণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব করছেন। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করতে জনমত সৃষ্টি করেন। যৌতুক প্রথা বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঝরে পড়া শিশুদেরকে (ছেলেমেয়ে) স্কুলে আনতে চেষ্টা করেন। নিজস্ব তহবিল থেকে তাদেরকে অনেক ক্ষেত্রে খরচ পাতি দেন। তার এ কর্মপ্রবাহ বয়ে চলে নীরব ফল্গুধারার মত। অত্যন্ত প্রচার বিমুখ এ ভদ্র মহিলা। একান্ত আলাপচারিতায় অনেক কথা বলেছেন। স্কুলটি আমিরাবাদ ইউনিয়নের উক্ত সীমানায় অবস্থিত। দক্ষিণ চট্টগ্রামের এ বিদ্যাপীট ১৯৭৪ সালে তার মরহুম আব্বাজান শাহ আলম খাঁন প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের পরিবারটি অতীব বনেদী পরিবার। তার দাদী শিক্ষিত ছিলেন বলে তিনি (দাদী) প্রত্যেক ছেলেকে শিক্ষিত করেছিলেন। বাংলাদেশের অতিপরিচিত আমলা মরহুম খানে আলম খাঁন ও প্রথিতযশা ডাক্তার আমানে আলম খাঁন শায়লা খাঁনের বাবার সহোদর। শাহে আলম খাঁন দীর্ঘদিন ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ছেলে মেয়েদেরকে গ্রামের মানুষের কল্যাণে আত্মনিবেদনের জন্য শিক্ষা দিয়ে গেছেন। পিতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে শায়লা খান এ স্কুলের ছাত্রী থাকাকালীন কল্পনা করতেন যদি সুযোগ আসে তাইলে তিনি বড় হয়ে এলাকার মানুষের কাছাকাছি আসবেন। চট্টগ্রাম কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নের প্রাক্কালে তার বিয়ে হয়ে যায়। তখন ভাবলেন আশা হয়তো পুরন হবে না। ভাবতেন বেগম রোকেয়ার সকল কর্মকান্ডে যদি সাখাওয়াত হোসেনের অনুপ্রেরণা হয়, তাহলে তার অগ্রযাত্রায় মোহাম্মদ উল্লা কেন হতে পারবেন না? তার স্বামী ও শ্বাশুড়ির উদারতায় তিনি শ্বশুর বাড়ি থেকেই এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৪ সালে তার পিতা পরলোক গমন করেন। সে সময় তিনি স্কুলে এসে প্রতিষ্ঠানটির জীর্ণদশা দেখে ব্যথিত হয়ে পড়েন। ২০০৭ সালে বহু সিড়ি অতিক্রম করে স্কুলটির হাল ধরেছেন। তার দক্ষ পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি একাধিকবার জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে। তার একটি অনন্য বিচক্ষণতার স্বাক্ষর হলো সকলের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় ছাত্রীদের মননশীলতা ও মেধার বিকাশ ঘটে। বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুযোগ, ছাত্রীদেরকে যাকাত ফান্ড হতে আর্থিক দেয়া, পোষাক বিতরণ। শরীরচর্চা, খেলাধুলা, বিতর্ক প্রভৃতি বিষয়ের উপর তার প্রখর দৃষ্টি রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অর্জন ২০১৪ সালে শতকরা শতভাগ বলে প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ জানিয়েছেন। যোগ্য পিতার যোগ্য কন্যা হিসাবে স্কুলের জমি কিনে দিয়েছেন। সরকারী নীতিমালায় রেজিষ্ট্রেশন ফি’র আধিক্যের কারণে ফান্ডের অভাবে এ জমির রেজিষ্ট্রি দলিল সম্পাদন করা যাচ্ছে না। তবে অদম্য নারী তাতে বিচলিত নন। নারী ও শিশু বান্ধব এ নারী আগামী দিনে ছাত্রীদের কল্যাণে প্রতিষ্ঠানটি কলেজে রূপান্তর, দর্জি ও ভোকেশনাল ইনষ্টিটিউট প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন পথে না নামলে পথের শেষ ঠিকানা পাওয়া যায় না। তিনি অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার সংকল্পে অটল। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানে ভবন ও আসবাবপত্রের সমস্যা প্রকট। পাঠাগার, কম্পিউটার ও কমনরুমের সুব্যবস্থা নেই বলে প্রধান শিক্ষক জানালেন। তবে বর্তমান পরিচালনা কমিটির সভাপতি থাকলে এসব সমস্যার সমাধান সময়ের ব্যাপারে মাত্র প্রধান শিক্ষক এমন মন্তব্য করলেন। স্কুলের আশপাশ এলাকার মানুষ অতিশয় দরিদ্র। দিন মজুর ও কৃষিকাজ করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। হাতেগোনা লোক সমর্থবান। হতদরিদ্র বলে অনেকে কম বয়সে কল্যা সন্তান বিয়ে দিয়ে দেন। আবার এসএসসি পাশের পর ধারে কাছে কলেজ না থাকায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন না। পারছেন না। অনেক সময় কিশোরী অবস্থায় লেখাপড়া করতে না পেরে ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহের ফলে সংসারে অশান্তি নেমে আসে। যৌতুকের কারণে অনেকে মেয়ে বিয়ে দিতে পারেন না। স্যানিটেশন কি তা অনেক পরিবার প্রধান জানে না। এ সবই হচ্ছে অশিক্ষা। শায়লা খাঁন সমস্যা সমূহ মাঠ পর্যায়ে ঘুরে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন ঝরে পড়া কন্যা শিশুদেরকে যদি সেলাই শিক্ষা দেয়া যায় আর একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করলে নারীদের উচ্চ শিক্ষার জন্য দূরের কলেজে যাবার প্রয়োজন হবে না। আর সেলাই শিখে মেয়েরা নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াতে পারবে। একজন গৃহবধু হয়েও শায়লা খাঁন অন্ধকারে আলো দানের জন্য চেরাগ হাতে প্রতি সপ্তাহেও প্রায় দিন আমিরাবাদে ছুটে আসেন। স্কুলেই সময় কাটান। নারীর কল্যাণ ও নারী শিক্ষার প্রতি মমত্ববোধ একদিন এলাকাবাসী তাকে যারা ইতিহাসের নারী জাগরণের অগ্রদূত সে সব মহিয়সীর সাথে তুলনা করবে সমাজ। এমনটাই মন্তব্য করলেন এলাকাবাসী।

পাদটীকা : লোকালয়ে প্রকাশিত চার বিধবার অনাহারে অর্ধহারে দিনযাপন শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন পড়ে অনেকে তাদের পুনর্বাসনে এগিয়ে আসার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। লোহাগাড়া ইউএনও মোহাম্মদ ফিজনূর রহমান বিধবাদেরকে তার অফিসে ডেকে আগামী দিনে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাৎক্ষণিক প্রত্যেকের হাতে একটি করে কম্বল তুলে দেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*