ব্রেকিং নিউজ
Home | শীর্ষ সংবাদ | চুপ, হারামজাদা (স্মৃতিপত্র গল্প- ১২)

চুপ, হারামজাদা (স্মৃতিপত্র গল্প- ১২)

299

অধ্যাপক মুহাম্মদ আবদুল খালেক : ঈদ মানে খুশী বা আনন্দ। ঈদ মানে উৎসব। ঈদ’ত সবার। লোহাগাড়া পুরান থানা রোডস্থ টুনু কোম্পানী কোরবানী তথা ঈদুল আযহাকে বলে থাকেন ‘আল্লাহ’র মেজবানী’।

দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই মাংস খেতে পারবে নাকি ? হ্যাঁ, পারবে। আমার সহকর্মী আরবী প্রভাষক মাওলানা তাহের আহমদকে বল্লাম, ‘কুরবানীর মাংস অমুসলিমরা খেতে চাইলে দেবো’? কিতাব দ্যাখে বলবেন। উনি রাতে ফোনে বল্লেন, ‘কিতাব সামনে, অমুসলিমরা কুরবানীর মাংস খেতে চাইলে দিতে পারবেন’।

আমি বিষ্মিত হলাম। অনেক মাওলানাকে জিজ্ঞেস করেছি; উনারা বল্লেন- ‘নাজায়েয’।

তখন আমার মনে পড়লো পটিয়া মাদ্রাসার প্রখ্যাত আলেমেদ্বীন মুফতি সামশুদ্দিন জিয়ার কথা। তিনি এক আলোচনা সভায় বল্লেন, আমাদের মাওলানারা যেটা জানে না; সেই বিষয়ে কেউ জানতে চাইলে বলে দেন ‘নাজায়েজ’।

আসলেই ঘটনা তাই। কিতাব না দ্যাখে ফতোয়া দেয়া ঠিক নয়। ফেত্না সৃষ্টি হতে পারে। এখন’ত যে কেউ ফতোয়া দেয়।

অনেকে বলে বেড়ায় ‘নারী শিক্ষা নাজায়েজ’।

আনোয়ারা থানার হাইলদর মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা মুফতি আব্দুল মালেক হালিম একবার আমাকে দাওয়াত দিলেন। উনার মাদ্রাসায় যেতে হবে। বয়ান রাখতে হবে। আমি’ত কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মনে মনে ভাবলাম ‘বোধ হয় কেয়ামত অতি নিকটে চলে এসেছে’।

চকরিয়া হতে ফিরতেই আমিরাবাদের আশরাফিয়া লাইব্রেরীতে রীতিমতো উনি অপেক্ষা করছেন। আমি উনার সাথে যেতে পারলাম না। পরে ইব্রাহিম হুজুরের সাথে রওয়ানা দিলাম। রাত ৮ টায় পৌঁছলাম। মেহমান খানায় রাত্রি যাপন। ভোর রাতে ওঠলাম। শুনতে পেলাম, ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। তাহাজ্জুদ আদায়। বাদে ফজর মুহতামিম ঘোষণা দিলেন, ‘এক বড়ো মেহমানকে আমরা পেলাম, উনি ওস্তাদদের উদ্দেশ্যে বয়ান পেশ করবেন। কিভাবে পড়ালেখা করাতে হবে, কৌশল-পদ্ধতি নিয়ে’।

আমার বয়ানের পূর্বে কোরান তেলাওয়াত হলো। সুরের তালে ছন্দে আমি বিভোর-বিমোহিত-মুগ্ধ। আমি প্রায় ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট বয়ান রাখলাম। তারপর মুহতামিমের বয়ান। উনি কেঁদে কেঁদে বয়ান রাখছেন। আমিও কাঁদলাম। উনি বল্লেন, মহিলা মাদ্রাসা খোলার পর বড়ো বড়ো আলেমরা আমাকে গালমন্দ করেছে। নাজায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছে। এমনকি মুরতাদও বলেছে। এখন তাঁরা বুঝতে সক্ষম হয়েছে। এবং নারী শিক্ষাকে সমর্থন করছে। মুহতামিম বল্লেন, নারী শিক্ষা ব্যতিরেকে মুসলমান’র ভাগ্যের পরিবর্তন অসম্ভব। উনি বল্লেন, পর্দার আড়ালে থেকে যে তেলাওয়াত করেছে, সে আমার বড়ো মেয়ে; মহিলা শাখার প্রধান, মুহাদ্দিস। শোকর আলহামদুলিল্লাহ।

এবারের ঈদুল আযহায় ব্যতিক্রম আনন্দে কেটেছি। সুদূর অতীতে বিচরণ করেছি। এক সময় আমার বাবা ভাগে কুরবানী দিতো। এখন ভাগে দিতে হয় না। অবস্থা আর ব্যবস্থার পরিবর্তন। আবার এমনও হয়েছে আমার বাবা ভাগেও কুরবানী দিতে পারেনি। ওই সময়ের কথা বেশি মনে পড়ছে। ভাবনা আর কল্পনার ঢেউয়ে দোল খাচ্ছিলাম। মনে পড়লো, ‘চিরদিন সমান কাহারো নাহি যায়’। আসলে তাই।

আমাদের পাড়ায় অনেকেই এখন কুরবানী দেয়। কিন্তু মাংস বিলি করে কম। ফ্রিজে টাইট। আল্লামা ফজলুল্লাহ ফাউন্ডেশন মাধ্যমে ২০ জনের জন্যে কুরবানীর মাংস পেয়েছিলাম। পাড়ার ২০ জনের হাতে কুরবানীর মাংস তুলে দিয়েছি। ব্যতিক্রম আনন্দ দেখেছি ওই ২০ জনের চেহেরায়। ওই মাংসে ছিলো ভালোবাসার গন্ধ। এমনিতে কুরবানীর মাংসের গন্ধ আলাদা, স্বাদও আলাদা। ত্যাগেই সুখ, ত্যাগেই আনন্দ। (চলবে….)

লেখক : সম্পাদক, লোহাগাড়ানিউজ২৪ডটকম; প্রভাষক (বাংলা বিভাগ), আধুনগর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, লোহাগাড়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*