ব্রেকিং নিউজ
Home | উন্মুক্ত পাতা | চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন’র ২০তম মৃত্যু বার্ষিকীতে স্মরণ

চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন’র ২০তম মৃত্যু বার্ষিকীতে স্মরণ

35

মোঃ জামাল উদ্দিন : গ্রামীণ জনপদে ঘুরে বেড়ানো চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন। যিনি ১৯৯৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ফুলছড়ি ফেরী পার হতে গিয়ে ফেরী হতে পড়ে যান। মৃত্যুবরণ করেন ব্রহ্মপুত্র নদীতে। দেখতে দেখতে তার বিশতম মৃত্যু বার্ষিকী এসে গেল। তাকে একজন বন্ধু হিসাবে আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তাকে ঘিরে পারিবারিক, সংবাদ সংগ্রহকালীন বহু ঘটনা, মান-অভিমান, রুচি-অভিরুচি ও ঘটনা-দূর্ঘটনার বহু স্মৃতিকনা বর্ণনা করার ইচ্ছা পোষণ করছি। ১৯৮৪ সালে তার সাথে আমার পরিচয়। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ করা প্রয়োজন সাংবাদিক কামাল লোহানীর বন্ধু বগুড়া হতে প্রকাশিত দৈনিক উত্তরাঞ্চল পত্রিকার সম্পাদক প্রয়াত দুর্গাদাস মুখার্জীর পত্রিকায় এ প্রতিবেদক কাজ করতেন। ১৯৮৪ সালের প্রথম দিকে বগুড়ায় পিআইবি’র উদ্যোগে বগুড়া পর্যটন মোটেলে ভারত-বাংলাদেশ- নেপাল প্রভৃতি দেশের গ্রামীণ সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকের এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সে কর্মশালার অন্যতম সমন্বয়ক ছিলেন সাংবাদিক কামাল লোহানী। আমি একজন ফটোগ্রাফার হিসাবে অনুষ্ঠান কভার করি। পরবর্তীতে আমার ক্রেডিটে পিআইবি থেকে প্রকাশিত নীরিক্ষায় ছবিগুলো ছাফা হয়। অপরদিকে, কর্মশালা উপলক্ষে প্রকাশিত বুলেটিন ‘লোকালয়’ সম্পাদনার দায়িত্ব নেন সাংবাদিক প্রদীপ ভট্টাচার্য্য শংকর আর অফসেটে ছবিগুলো ছাপা হয়েছিল আমার ক্রেডিটে। মোনাজাতউদ্দিন অত্যন্ত ছবি পাগল মানুষ ছিলেন। তিনি নীরিক্ষা ও লোকালয়ে ছাপানো ছবির সূত্র ধরে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন সে খবর আমি জানতাম না। হঠাৎ একদিন তার সাথে বগুড়া সাত মাথায় আমার পরিচয় হয়। বগুড়া প্রেস ক্লাবের তদানীন্তন সম্পাদক সাজ্জাদ আলী সন্তোষের মাধ্যমে। সে থেকে তিনি আমার সাথে একান্ত হয়ে যান। সাধারণ মানুষের কথা লিখতেন বলে তাকে অনেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন। খিস্তি খেউরী করে বলতেন ফকিরনীর সাংবাদিক। অনেক সাংবাদিক তাকে দেখলে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। আমার কাছে একটু ভালবাসা পেয়েছিলেন বলে হয়তো বগুড়া আসলে সোজা আমার আস্তানায় চলে আসতেন। আমার বাসায় বসে কালজয়ী সিরিজ প্রতিবেদন ‘কানসোনার মুখ’ লিখেছেন। আমার স্টুডিওতে ছবিগুলো প্রিন্ট করা হয়। আমার বাসা হতেই তিনি ফিলিপস পুরস্কার নিতে ঢাকায় যান। এ এক বিচিত্র কাহিনী। কানসোনার মুখ দৈনিক সংবাদে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে হৈ চৈ পড়ে যায়। সংবাদের তদানীন্তন রাজশাহী প্রতিনিধি মলয় ভৌমিকের বাড়ি কানসোনা গ্রামে। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার একটি সমৃদ্ধ জনপদ কানসোনা। মলয় ভৌমিকের সূত্র ধরে মোনাজাতউদ্দিন কানসোনা গ্রামে যান। তথায় ময়ল ভৌমিকের বাড়িতে ১২ দিন অবস্থান করেছিলেন বলে তার (ময়ল) বড় ভাই সাংবাদিক কল্যাণ ভৌমিক জানিয়েছেন। কল্যাণ ভৌমিক তখন রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তার উল্লাপাড়া প্রতিনিধি ছিলেন। মোনাজাতউদ্দিন কানসোনা গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে প্রতিবেদন তৈরী করেন। ভৌমিক পরিবারই এ গ্রামের একমাত্র হিন্দু পরিবার। দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের সময় মুসলিম সম্প্রদায় তাদের যে সহযোগিতা দিতেন তা ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ। এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। আরো তিনি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রতিবেদন লিখেন উল্লাপাড়া কলেজের একজন মেধাবী ছাত্র সম্পর্কে (সংগত কারণে নাম প্রকাশ করা হলো না) যিনি মাঠে অর্ধেক বেলা জন খেটে পড়ালেখা করছিলেন। অনেক সময় অনাহারে অর্ধাহারে তার দিন কাটতো। এ প্রতিবেদন পড়ে তদানীন্তন অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ছাত্রটির পড়ালেখার ভারগ্রহণ করেন। তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুযোগ করে দিয়েছিলেন। বর্তমানে সে ছাত্রটি একজন ডাকসাইটে আমলা। উপ-কর কমিশনার হিসাবে কর্মরত বলে কল্যাণ ভৌমিক সূত্রে জানা যায়। আর একজন ডাক বিভাগের কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রী আনোয়ারা বেগম। আমলাতান্ত্রিক জঠিলতায় তার স্বামীর পাওনা থেকে তিনি বঞ্চিত হতে চলেছিলেন। মোনাজাতউদ্দিন সে কাহিনী সংবাদে ছাপানোর পর আনোয়ারা তার স্বামীর প্রাপ্য টাকা পেয়ে যান। বর্তমানে তিনি পুত্র-কন্যাদের সাথে ঢাকায় অবস্থান করছেন। কানসোনার মুখ সিরিজ প্রতিবেদন পাঠ করে তদানীন্তন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলাম খোঁজ খবর নিতে শুরু করেন। প্রতিবেদনে বগুড়ার জামাল উদ্দিনের (এ প্রতিবেদক) নাম থাকায় মন্ত্রীর ধারণা হয় এলাকাটি বগুড়ায় অবস্থিত। তিনি তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান হায়দার আলীর মাধ্যমে এ প্রতিবেদকের কাছে বিস্তারিত জানতে লোক পাঠান। পরে উল্লেখিত যুবক ও আনোয়ারাকে বগুড়ায় এনে হায়দার আলী আর্থিক অনুদান তুলে দিয়েছিলেন। মোনাজাত উদ্দিনের কায়মনো প্রার্থনার মত রিপোর্টের ভিত্তিতে কতজনের যে ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে তার সংখ্যা লিখা কঠিন। আর এক যুবকের কথা বলা যায় যিনি রিক্সা চালাতেন। রিক্সা চালিয়ে নট্রামস-এ টাইপ শিখতেন। যথা প্রশিক্ষণের ফি দিতে না পারায় তার টাইপ প্রশিক্ষণ বন্ধ হতে চলেছিল। প্রতিবেদনটি পাঠ করে শিল্প ব্যাংকের তদানীন্তন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বগুড়া ব্রাঞ্চের ব্যবস্থাপককে যুবকটির খোঁজ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুবকটিকে অস্থায়ী ভিত্তিতে ব্যাংকে টাইপিষ্ট হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে যুবকটি অন্য ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আজ অনেক কথাই মনে পড়ছে। গ্রামীণ এ সাংবাদিক অত্যন্ত সাদাদিসে জীবন যাপন করতেন। তার নিউজ সোর্স ছিল বাঘা বাঘা আমলা ও সাধারণ মানুষ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামীলীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে অত্যন্ত সু-সম্পর্ক ছিল। আমি এও জানি মোনাজাতউদ্দিনের দেয়া টাইম সিডিউল অনুযায়ী উত্তরবঙ্গের অনেক স্থানে এ দু’নেত্রীর জনসভার দিন নির্ধারিত হতো। কোনদিন তাকে আমি বড় বড় সভায় সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত টেবিলে বসে নোট নিতে দেখিনি। মাইকের গোড়ায় গাড়িয়ে নোট নিতেন। খবরের পিছনের সংবাদ সংগ্রহ করতেন। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণের ধরণই ছিল আলাদা। ছোট্ট একটি ঘটনা দিয়ে শেষ করতে চাই। ১৯৮৭ সালে বন্যার সময় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী মোনাজাতউদ্দিন সহ আমরা কয়েকজন সাংবাদিক গাইবান্ধা যাচ্ছিলেন বন্যদুর্গত এলাকায়। যাত্রা পথে খালেদা জিয়ার সাথে শেখ হাসিনার গাড়ি অতিক্রম করার সময় উভয়ে কথা না বললেও একটু হাসেন। খালেদা জিয়া রংপুর থেকে ঢাকা ফিরছিলেন। গাইবান্ধার বন্যাকবলিত মানুষের রিপোর্টের সাথে আরো একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল “শুধু হাসি বিনিময়” এ হলো খবরের পিছনের খবর। গ্রাম বাংলার কল্যাণে নিবেদিত হোক সাংবাদিকতা এ বোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে আজীবন হেঁটে চলেছেন পথ থেকে পথে। সাংবাদিকতায় একুশে পদক পেয়েছেন। তার স্ত্রী নাছিমা বেগম ইতি বলেছেন মোনাজাতউদ্দিনের স্ত্রী হতে পারা গৌরবের ও গর্বের। আজ তিনি নেই। একজন বন্ধু হিসাবে আমি এবং আমরা যারা বেঁচে আছি তারাও গর্বিত। আমাদের জন্য তিনি যে পথ রেখে গেছেন তা সত্য ও সুন্দরের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*