ব্রেকিং নিউজ
Home | লোহাগাড়ার সংবাদ | কুলা কারিগর মোহাম্মদ আলী

কুলা কারিগর মোহাম্মদ আলী

21

মোঃ জামাল উদ্দিন : লোহাগাড়া উপজেলার পদুয়া আলী সিকদার পাড়ায় মোহাম্মদ আলীর বাস। কুলা (শষ্যাদি ঝাড়িবার ডালা বিশেষ) বানিয়েই জীবনের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে এসেছেন। জীবনের চলার পথে বহু স্বপ্ন দেখেছিলেন। কোনটাই পূরণ হয়নি। সে সবের হিসাব মেলান না। তিনি মারা গেলে তার পরিবারের কেউ এ পেশা ধরে রাখবেন না। তার দাদা, বাপ ও তিনি শতাব্দীকাল ধরে এ পেশা আকড়ে ধরে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়েছেন। স্মৃতির ঢেঁকুর তুলে মোহাম্মদ আলী বললেন, আগে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ছিল কৃষি ভিত্তিক। যার যত জমি তিনি তত ধনী। মানুষ নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে পার্শ্ববর্তী দেশ বার্মা (মিয়ানমার) যেতেন। বার্মার আকিয়াব ছিল অত্যন্ত উর্বর এলাকা। সেখানে নারী স্বাধীনতা প্রবল। অনেকে বার্মা ললনার প্রেমে পড়ে আর দেশে ফিরে আসতেন না। তখন বার্মাতে কুলা ও জাল রপ্তানী হতো। অনেকে কুলা তৈরীর জন্য আগাম অর্ডার দিতেন। হাটবাজারে কুলা বিক্রি হতো প্রচুর। তাই কুলা কারিগরদের বেজায় কদর ছিল। গ্রামীণ বিয়ে শাদীতে পাঁচ কুলার ধান ভানা ছিল আবশ্যিক কর্ম। পাঁচকুলার অনুষ্ঠানের কুলা অবশ্যই নতুন হতে হতো। আবার গ্রীষ্মের খরতাপে যখন প্রকৃতি খাঁ খাঁ করতো তখন গ্রামবাসীরা “আল্লা মেঘ দে পানি দে” বলে বৃষ্টি যাচনা করতে বেরুতেন। দল বেঁধে কায়মনো প্রার্থনা সংগীত গেয়ে কুলা মাথায় গৃহস্তের দ্বারে দ্বারে ঘুরতেন। বৌ ঝিরা কুলা বহনকারীর মাথার উপরে ঘটি দিয়ে জল ঢেলে দিতেন। আর কুলা বহনকারী সে জল চতুরদিকে ছিটিয়ে দিতেন। তখন নতুন আবহ সৃষ্টি হতো। সমম্বরে সবাই গেয়ে উঠতেন “কালা মেঘা ধলা মেঘা তারা শুদ্দর ভাই/এক লাচা ঝড় দ্দেরে ঘরে ফিরে যাই”। অনেক গৃহস্তের বধুরা আল্লাহর ওয়াস্তে কুলা ভর্তি করে শষ্য দান করতেন। পরে এ সব শষ্য দিয়ে শিরনী পাকান হতো। বৃষ্টির প্রার্থনার এ মিছিলে জাতি, ধর্ম, বর্ণের ভেদাভেদ ছিলনা। হিন্দুর কুলার চাল মুসলমানের কুলার চালের সাথে মিশে একাকার হতো। পরে লোকালয়ের সুবিধাজনক স্থানে শিরনী পাকানোর অনুষ্ঠান হতো। সমবেত মানুষ দু’হাত তুলে বিধাতার কাছে যে যার মতো প্রার্থনা করতেন। ঠিকই তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামতো। শুভ কাজে ধান দুর্বা দিয়ে কুলা সাজানো হতো। বিবাহ উৎসবে কুলা দিয়ে গেট বানানো হতো। ধান ভানতে ঢেকির শব্দ ছিল অত্যন্ত ছন্দময়। কুলা দিয়ে ঝেড়ে তুষকুড়া আলাদা করার পর চালুনী দিয়ে ঢেকিছাটা চাল বের করা হতো। উপরে পড়ে থাকতো আকাড়া ধান চাল। সে আকাড়া ধান চালকে বলা হতো মলুক। ঢেকি বিদায় নিয়েছে বহু আগে। এখন কুলার যাত্রা ঘন্টি বাজছে। একদিন হয়তো কুলাও বিদায় নেবে। বিদায়ের পুর্বাভাষ হিসাবে মোহাম্মদ আলী বলছেন এখন মেশিন দিয়ে চাল ভাঙা হয়। কুড়া আলাদা করা হয়। বৌ-ঝিদের অনেকের কাছে কুলা অচেনা হয়ে যাচ্ছে। মোহাম্মদ আলীর আক্ষেপ কুলার মত তিনি যে ছিলেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা মনে করবে না। তার বয়স যখন ৯ বৎসর তখন থেকে এ কাজে হাতেখড়ি নিয়েছেন। বাবার কাছ থেকে। এখন তার বয়স ৫৯ বৎসর। তার পিতা মরহুম দলিলুর রহমান অত্যন্ত আদর্শবান মানুষ ছিলেন। তখন একটি কুলা বানাতে নামমাত্র খরচ হতো। বাঁশ-বেত পাওয়া যেত সুলভে। এখন এসব মহার্ঘ। একটি কুলা বানাতে ৮০-১০০ টাকা খরচ হয়। নামমাত্র শ্রমের দাম থাকে। আগে তারা পাঁচ ভাই কুলা বানাতেন। তারা এখন এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। অর্ধশতাধিক পরিবার নিকট অতীতেও এ পেশায় জড়িত ছিলেন। বর্তমানে যা পাঁচ ঘরে এসে ঠেকেছে। অচল খাত দেখিয়ে কুলা বানাতে সরকারী- বেসরকারী সংস্থার লোকজন কোন ঋণ দেয় না। মোহ্মামদ আলীর দু’ছেলে, দু’মেয়ে। এক ছেলে ঠোঙা বানায়। অন্যজন কাপড়ের দোকানে চাকুরী করে। মেয়েরা লেখাপড়া করছে। মোহাম্মদ আলী মেয়েদেরকে মানুষের মত মানুষ করতে চান। আবহমান বাংলার নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে। যার অনেকগুলো অতীতের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পালকি, ঢেকি হাতে বুনন তাঁত, হাতে বানানো নাঙল, আইলের পাড়ে পান্তা খাওয়া আজ নেই বললেই চলে। কামার, কুমার, তাঁতীরা অন্য পেশায় চলে গেছেন। একদিন হয়তো কুলা বানানোও হারিয়ে যাবে। তখন ভবিষ্যত থমকে গিয়ে প্রশ্ন করবে, কুলা আবার কি জিনিস ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*