ব্রেকিং নিউজ
Home | উন্মুক্ত পাতা | আত্মত্যাগের কোরবানী ও সামাজিকতার কোরবানী! এবং তাকওয়া….!

আত্মত্যাগের কোরবানী ও সামাজিকতার কোরবানী! এবং তাকওয়া….!

1450961_738919732884675_7357765962041581766_n (1)

সুমীর বিয়ে হয়েছে ৭/৮ মাস হলো, সুমীর স্বামী শাব্বির মোটামুটি সচ্ছল পরিবারের সন্তান, তার বন্ধুবান্ধব বেশী, হাত খোলে টাকা পয়সা ব্যায় করতে পারলে বর্তমান সমাজে বন্ধুবান্ধবের অভাব হয়না, সুমীর স্বামীর বেলায়ও তাই……। সুমীর বিয়ে হয় এক কাকতালীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে….. ঘটনা ১. সুমীর খালাকে আনা হয়েছে হসপিটাল থেকে, খবর পেয়ে সুমীর মা শাহানা একমাত্র বোনকে দেখার জন্য অস্থির শাহানা স্বামীর অনুমতি নেয় একমাত্র বোনকে দেখতে যাবার জন্য, সুমিও বায়না ধরে খালাকে দেখতে যাবে। চট্টগ্রাম মেড়িকেল কলেজে সুমী’র খালার সফল অস্ত্রোপচার হয়, ওনার কিডনিতে পাথর হয়েছিলো…..! সুমী ও সুমীর মা শাহানা রোগীর বাড়িতে পৌঁছে বিকাল ৪ টার দিকে, পৌঁছেই দির্ঘ্যদিন দেখা না হওয়ার বেদনা ভরা হূদয়ের আকুতির কান্নায় অশ্রুই ভেজা চোখ উভয়ের!! সুমীরা আজ রাতে খালার বাড়িতেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত, পর দিন সকলে চলে যাবে…. রাত শেষ, পর দিন সকালে নাস্তা সেরে চলে আসবে নিজ বাড়িতে, বাড়িতে চলে আসার প্রস্তুতি কালে সুমীর খালার পাশের বাড়ির ঘনিষ্ট একজন সুমীর মায়ের সাথে কথা বলার আগ্রহ প্রকাশ করেন!! কি কথা তা জেনে সুমীর মা কথা বলবেননা বলে জানিয়ে দেন। সুমীর মা বলেন সুমীর মূল অভিভাবক সুমীর বাবা, ওনিই এ ব্যাপারে কথা বলবেন….। সুমীর বিয়ের ব্যাপারে কথা না বললেও সুমীকে যে পছন্দ হয়েছে তা জানাতে কার্পণ্য করেনি শাব্বির এর মা….. শাব্বিরের মা এসেছিল সুমীর খালাকে দেখতে, সুমীর আচার আচরণ পোশাক আশাক চলাফেরা দেখে শাব্বিরের মা ছেলের জন্য পছন্দ করেছে সুমীকে। পছন্দের কথা শুনেই শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরলো মা মেয়ে…..! ঘটনা ২. কয়েক দিন পর শাব্বিরের পরিবারের পক্ষ হতে পারিবারিক ভাবে সুমীকে দেখতে যাবার আমন্ত্রণ জানায়…! সুমীর পরিবারের পক্ষ থেকে জাননো হয় আমরা কয়েক দিন সময় চাই, কয়েক দিন সময় নেয়ার উদ্দেশ্য হলো শাব্বির ও শাব্বিরের পরিবার ও পরিবেশ এবং ধার্মিকতার বিষয়টি জেনে নেয়া। সুমীর পরিবারের পক্ষ হয়ে শাব্বিরের ব্যপারে বিস্তারিত জেনে সুমীকে দেখতে আসার আমন্ত্রণ গ্রহণের সংবাদটি জানিয়ে দেয়। সংবাদ জেনে শাব্বিরের পরিবারের সবাই খুশি, শাব্বিরের পছন্দ হলেই সুমীকে ছেলের বউ করে ঘরে তুলবে, এমনটাই শাব্বিরের মায়ের অভিব্যক্তি! সুমীকে দেখতে যাবার প্রস্তুতি শেষ করে, শাব্বির ও তার ছোট বোন এবং মা এক সাথে একটি সিএনজি অটো রিক্সায় করে সুমীদের বাড়িতে যায়। নাস্তা পর্ব শেষ করে, বাকি সুমীকে দেখার আনুষ্ঠানিকতা…..! সুমীকে নিয়ে আসা হলো…… কিছুটা দূরত্ব রেখে সামনা সামনি বসানো হলো, পাত্র-পাত্রী উভয়েই শারীরিক ভাষায় লাজুকতার প্রলাপ! শাব্বিরের ছোট্ট বোন ইশারায় ইংগিত করে বড় ভাইকে সুমীর সাথে কথা শুরু করার জন্য! শাব্বির কথা শুরু করে…. শাব্বিরঃ- আস্সালামু আলাইকুম, আপনার নাম কি? সুমীঃ ওয়ালাইকুম সালাম ওরাহামতুল্লাহি ওবরাকাতহু। আমার নাম নাসরীন সুলতানা সুমী। শাব্বিরঃ- পড়াশোনা কতটুকু করেছেন? কোন স্কুলে? সুমীঃ- জবাব দেয়। শাব্বিরঃ – ইসলামের ৫টি স্তম্ভ কি কি? সুরা ফাতেহা এবং সুরা ইখলাস অনুবাদ সহ জানান প্লিজ। সুমীঃ- চটপট বলে দেয়। শাব্বিরঃ- সব শেষে সুমী মা বাবা ও পরিবারের সদস্যদের নাম জানতে চায়। সুমীঃ- জবাবে সবার নাম বলে । শাব্বিরের প্রশ্ন করা শেষ করে, বলেন আপনার কোন প্রশ্ন থাকলে বলতে পারেন….. সুমী নাম জানতে চায় কয়েকটি প্রশ্নের পর সুমী বলে আপনি কি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন? ?সুমীর প্রশ্নে শাব্বির কিছুটা বিব্রত হয়! বলে নামাজ কিছুটা অনিয়মিত! ! প্রশ্ন উত্তর পর্ব শেষ করে সুমী চলে যায় তার রুমে। শাব্বিরের মা ইশারায় জানতে চাই ছেলের কাছে মেয়ে পছন্দ হয়েছে কিনা! শাব্বির হা সুচক ইংগিত করে মাথা নাড়ায় লজ্জামাখা চেহারায়। শাব্বিরের মা সুমীর মাকে জানায় ছেলের পছন্দের কথা…! সব সৌজন্যতা শেষ করে এবার বিদায়ের পালা….। উভয় পক্ষ সিদ্ধান্ত নিলো আসছে শুক্রবার ছেলের বাবা ও মেয়ের বাবা এক সাথে বসে বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। এই কথা গুলো বলেই শাব্বিরের মা শাব্বিরের বোন শাব্বির বিদায় নেয়। ঘটনাঃ ৩. শাব্বিরের বাবা অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে সুখবর জানার জন্য! তিনি অবশ্য এর আগেও এই ধরনের অপেক্ষা করে কয়েক ববার হতাশ হয়েছেন! ! তার পরও বাবার মনতো এমনই ছেলে খুশি হলেই বাবাও খুশি। সিএনজি অটো রিক্সা বাড়ির উঠোনে এসে দাড়াতেই অপেক্ষার পালা শেষ হলো শাব্বিরের বাবার। শাব্বির ড্রাইভারকে বিদায় করতেছে… এই দিকে শাব্বিরের মা হাসি ভরা মুখে শাব্বিরের বাবাকে আলহামদুলিল্লাহ মেয়েটিকে পছন্দ হয়েছে ছেলের…. …. …. …. …. শাব্বিরদের ঘরে যেন ঈদের খুশি! !! শুক্রবার আসার বাকি মাত্র ৩ দিন, শুক্রবারে জুমার নামাজের পরে আলোচনার ব্যপারে অবগত করে দেন শাব্বিরের মা শাব্বিরের বাবাকে। এই দিকে সুমীদের বাড়িতে আলোচনা হচ্ছে…. ছেলে কেমন হবে! ইত্যাদি ইত্যাদি। সুমীর মা সুমীর কাছে জানতে চাই ছেলে পছন্দ হয়েছে কিনা! !! সুমী বলে হ্যাঁ মা পছন্দ হয়েছে… তবে আমার একটি শর্ত আছে…!!!! কি শর্ত বল… (((শাব্বির বলেছে তিনি নিয়মিত নামাজ পড়েনা!! ওনাকে বলতে হবে নিয়মিত নামাজ পড়তে হবে))) সুমীর মা হতভাগ!! ছেলেদেরকে শর্ত দিয়ে আজকাল বিয়ে হয়?! সুমীর মা বলেঃ বিয়ে হয়ে গেলে বিয়ের পর এইসব বিষয় নিয়ে কথা বলিস এখন এসব কথা তোলার দরকার নেই ….!! সুমী বলেঃ মা আমিতো আর কোন কঠিন শর্ত দিচ্ছিনা, মা, অনুগ্রহ বাবাকে বলবে এই বিষয়ে ওনাদের সাথে কথা বলতে। আচ্ছা ঠিক আছে……….!! ঘটনা ৪. শুক্রবার জুমার নামাজ সুমীদের বাড়ির পাশের মসজিদে পড়ার সিদ্ধান্ত নেয় শাব্বিরের বাবা, সুমীর বাবা সহ জুমার নামজের পর সুমীদের বাড়িতে খাওয়াদাওয়া করে। দুপক্ষের মাঝে কথা হয়। কথাবার্তা পাকাপোক্ত করে নেয় বিয়ের ব্যাপারে! এখন দিন তারিখ ঠিক করে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা করাটাই বাকি। দিন তারিখ ঠিক করে বিয়ে আনুষ্ঠানিকতা সেরে নেয়। বিয়েতে যৌতুকের দাবী না থাকলেও সুমীর বাবা উপহার হিসাবে ৮০ হাজার টাকার ফার্নিচার ও ফ্রিজ এবং ৩০০ মানুষ বর যাত্রী খাওয়ায়! !! বিয়ের পর মৌসমী পিঠা, ফল, ইত্যাদি সমাজের সংস্কৃতি অনুযায়ী দিয়ে আসছে। বিয়ে হয়েছে ৭/৮ মাস হলো, কয়দিন পর এখন ঈদুল আযাহা…….. চট্টগ্রামের বিশেষ সংস্কৃতি হচ্ছে বিয়ের পর প্রথম বছর কোরবানীর. সময় মেয়ের শশুর বাড়িতে কোরবানীর জন্য পশু দেয়া। গরু, মহিস, ছাগল অথবা বেড়া দেয়া!! [[চট্টগ্রামের বিশেষ সংস্কৃতি বলছি বাংলাদেশের অন্য এলাকার বিষয়ে খুব বেশি জানিনা।]] জামেলা এড়াতে সুমীর বাবা শাব্বিরের সাথে আলোচনা করে, বাবা শাব্বির কোরবানীর ঈদেতো পশু দেয়া হয়,!! এখন কি দেব ভাবছি…..! কি দিলে ভালো হয়? ? শাব্বিরঃ আব্বা মান সম্মানের প্রশ্ন দিলে এলাকায় বদনাম না হয় মত করে দিয়েন…..! সুমীর বাবা কথা শুনে নিজের ভেতরে *থ* মেরে গেছেন! বিয়েতে সামাজিক সংস্কৃতি বিবেচনা করে বাগানের গাছ বিক্রি করে বিয়ের আয়োজনের খরচ মিটাতে হয়েছে, বিয়ের অন্যান্য খরচের জন্য প্রায় ১ লক্ষ টাকা দার হয়েছে!! এখন বদনাম না হবার মত করে গরু কিনে দিতে গেলে অন্তত ২০/২৫ হাজার টাকা লাগবে। বিয়ের প্রথম বছর বলে দিতেই হবে কি আর করা!! সুমীর বাবা সিদ্ধান্ত নেয় গরু কিনে দেবে প্রয়োজনে ২৫ হাজার টাকার অগ্রীম জমির ধান বিক্রি করবে! ! অগ্রীম ধান বিক্রি করে কোরবানীর জন্য বদনাম না হবার জন্য গরু কিনে দেন!!!!। সুমীর বাবা সিদ্ধান্ত নেয় এই বছর কোরবানী দেবোনা!!!!! সুমীর বাবার কিনে দেয়া গরু কোরবানী করবেন শাব্বিরের পরিবার। প্রশ্ন হচ্ছে কুসংস্কৃতির সামাজিক দায়বদ্ধতার বেড়াজালে বন্দী হয়ে যে গরু দেয়া হলো তা দিয়ে কি কোরবানী হবে??? সূরা হাজ্জ্ব:37 এর বাংলা অনুবাদ – এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।।।।।। ঈদুল আজহার মর্ম কথা হলো তাকওয়া। তাকওয়ার পূর্ণ অর্থ হলো মুমিনের সেই সঙ্কল্প যাতে প্রয়োজনবোধে সে তার সব কিছু এমনকি তার নিজের জীবনটিও আল্লাহর পবিত্র নামে কোরবানি করতে সদা প্রস্তুত। কুরআন শরীফেও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষিত হয়েছে আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না (কোরবানির পশুর) রক্ত, পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। কোরবানি হলো উৎসর্গের আনন্দ উৎসব। পশু কোরবানি এখানে মুখ্য নয়। মুখ্য হলো মনের পশুত্বকে কোরবানি করা। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ কোরবানি করে তাকওয়া অর্জনই মূল লক্ষ্য। আল্লাহর ইচ্ছায় তার সন্তুষ্টির জন্য একজন মুসলিম যে নিজের জীবন ও অর্থ সম্পদ কোরবানি দিতে সদা প্রস্তুত, পশু কোরবানির মাধ্যমে সে এ কথার প্রমাণ পেশ করে। প্রশ্ন হলো লোক দেখানো মানে সম্মান রক্ষা করতে বা বদনাম রুখতে উপহার দেয়া পশু কোরবানী দিলে কি তাকওয়ার অধিকার আদায় হবে? কোরআনের কথা অনুযায়ী কোরবানী হবেনা । তাকওয়ার পূর্ণতা অর্জিত না করতে পারলে সমাজের এই কুসংস্কৃতি আমাদেরকে জাহান্নামের দরজায় পৌঁছে দেবে!! !! আল্লাহ আমাদেরকে কুসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে মুক্ত করুন, এবং আমাদেরকে সঠিক পথ দেখান। আমিন।

লেখক : আবদুর রহিম, পুটিবিলা, মাওলানা পাড়া, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*