ব্রেকিং নিউজ
Home | দেশ-বিদেশের সংবাদ | আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী

আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজশাহী

file (39)

নিউজ ডেস্ক : চলতি সপ্তাহের তিন দিনের ব্যবধানে রাজশাহী মহানগরীতে চারটি খুনের ঘটনায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও প্রগতিশীলমনা মানুষসহ নগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কে কোথায় কি করছেন, কখন যাচ্ছেন তা নিকট-আত্মীয় স্বজনরা জেনে রাখছেন। সব মিলে রাজশাহী এখন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে।

রাজশাহী মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, অভিজাত বাণিজ্যিক হোটেল নাইসে দুই শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার ও পরদিন সকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক একেএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে প্রকাশ্যে গলাকেটে হত্যার ঘটনা ঘটে।

এরপরই গত রোববার বিকেল ৪টায় নগরীর গ্রেটাররোডের নগর ভবনের সামনে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক চেম্বারে জিয়াউল হক টুকু গুলিবিদ্ধ হন। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভর্তির কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়। এসব পর্যায়ক্রমিক হত্যার ঘটনায় নগরীতে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দায়িত্ব পালন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে নগরীর বাসিন্দারা। চাঞ্চল্যকর এই চার খুনের তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে না। শুধু আটক আর জিজ্ঞাসাবাদের তথ্য দিচ্ছে পুলিশ।

এদিকে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ নগরীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রগতিশীল শিক্ষকরা হামলার আশঙ্খায় আতঙ্কিত। কখন কোথায় কিভাবে দুর্বৃত্তদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয় সে ভয় তাড়া করছে সব সময়।

রাবি প্রক্টরিয়াল অফিস সূত্র জানায়, অধ্যাপক ইউনুস আলী হত্যার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যা আতঙ্ক শুরু। এরপর প্রায় এক যুগে আরও তিন শিক্ষক খুন হয়েছেন।

২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক একেএম শফিউল ইসলাম লিলনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর জেএমবি, আনসার আল ইসলাম, লাল বাহিনী, পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা পার্টিসহ নামে বেনামে বিভিন্ন উড়ো চিঠিতে হত্যার হুমকি এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫ ডজন শিক্ষকের ঠিকানায়। তবে সর্বশেষ চলতি সপ্তাহে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল হত্যার পর প্রগতিশীল শিক্ষকসহ সুশীল সমাজে নতুন করে জঙ্গি হামলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

আতঙ্কের কথা জানিয়ে অধ্যাপক কথা সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রত্যেকটি মানুষ তার নিরাপত্তা নিয়ে এখন নজীরবিহীন আতঙ্কে। দুশ্চিন্তাগ্রস্ত আমাদের পরিবার ও স্বজনরা। এমন আতঙ্ক আর ভীতি এর আগে এতো বেশি দেখিনি। এধরনের হামলা থেকে মুক্তিও বুঝি সহসা মিলবে না।

বিশিষ্ট নাট্যকার মলয় ভৌমিক বলেন, আজ থেকে ২০ বছর আগেও যদি এধরণের চোরাগুপ্তা হামলা শুরু হতো তবে ঠেকানো যেতো না। কারণ যারা হামলা করছে তাদের লড়াইটা হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে। এই সুযোগ আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত দুর্বলতায় হচ্ছে। আমাদের নিজেদের স্বেচ্ছাচারি আচরণ ও উদাসিনতায় ঘটছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের মুক্ত বুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্রগুলো ক্রমান্বয়ে সীমিত হয়ে আসছে। এর বিপরীতে উস্কে দেয়া হচ্ছে ধর্মীয় চেতনা। রাষ্ট্রও যেন ভয় পাচ্ছে তাদের চোখ রাঙ্গানি।

তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে প্রক্রিয়ায় তদন্ত করছে মনে হচ্ছে না কিছু হবে। তাদের প্রক্রিয়া প্রি একটিভ নয়, আফটার একটিভ।

রাবি উপাচার্য অধ্যাপক মুহম্মদ মিজানউদ্দিন বলেন, অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যাই বলে দেয় প্রগতিশীলতার মানুষরা কতোটা নিরাপত্তাহীনতায়। যেকোনো মুহূর্তে আমার মাথায় চাপাতির আঘাত আসতে পারে।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক বিধান চন্দ্র দাস বলেন,  রেজাউল হত্যায় ভীষণ চিন্তায় পড়েছি। পরিবার আমাকে কোথাও একা যেতে দিচ্ছে না।  আপাতত পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের কথা গুরুত্ব দিতেই হচ্ছে, কেননা বাস্তবতা যে বদলে গেছে। রেজাউলের মতো নির্মোহ মানুষের যদি চাপাতির কোপে জীবন যায়, তাহলে আমার অবস্থাটা বুঝুন। আমার তো একটা রাজনৈতিক স্পষ্ট চেতনা রয়েছে।

রাবির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মর্তুজা খালেদ বলেন, আমি বিভাগ থেকে বেরিয়ে শহরে না বাসায় ফিরছি তা জানতে মেয়ে তিনবার ফোন করেছে। জুবেরি ভবনে শিক্ষকদের আড্ডার বাইরে বাসা ও বিভাগেই আমার আপাতত নিরাপদ জায়গা। এর বাইরে আমি কোথাও যেতে পারছি না। পরিবার উৎকণ্ঠায়। তাদের সে আশঙ্কাকে উড়িয়েও তো দিতে পারি না। কারণ একে একে তো চারজন শিক্ষককে খুন হয়েছে।

ইংরেজী বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. মো. শহীদুল্লাহ বলেন, অন্য শিক্ষকের ন্যায়  অধ্যাপক রেজাউল করিমও হত্যার হুমকি পেয়েছিলেন। মানুষ কেমন যেন বদলে গেছে গণ্ডারের চামড়া পরে যেন আছি আমরা। শক্ত প্রতিবাদের ভাষাও যেন আমাদের নেই!

রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, আশির দশকের পর রাজশাহীতে মৌলবাদীদের উত্থান ঘটে। এরপর একে একে খুন হলেন রাবির চার শিক্ষক। এসবের পেছনের শক্তিকে আমরা দেখছি না। দৃশ্যমান বিষয়টি নিয়েই পড়ে রয়েছি। অধ্যাপক তাহের হত্যায় জামায়াত-শিবিরের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে কারা তা স্পষ্ট করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জামায়াত-শিবিরকে সামনে এনে আসল খুনীদের আড়াল হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে।

রাজশাহী মহানগর (আরএমপি) পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন বলেন, তিন দিনে চার  খুনে আতঙ্ক ছড়িয়েছে এ কথা বুঝি বেশি বলা হবে। আমরা তদন্ত করছি। কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদও করছি। সহসাই খুনীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। শহরসহ রাজশাহীর প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধিকসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা নজরদারিও। আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য নগরীর সর্বসাধারণের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*